স্বর্ণে ঝুঁকছে বিশ্ব, ডলার আস্থায় ফাটল

ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও মুদ্রাস্ফীতির শঙ্কায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রেকর্ড কেনাকাটা।

টুইট ডেস্ক: চলমান বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো দ্রুতগতিতে স্বর্ণের মজুত বাড়াচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি, রাশিয়া, ইউক্রেন সংঘাত এবং ডলারের ওপর আস্থার সংকট,সব মিলিয়ে স্বর্ণ আবারও কৌশলগত সম্পদ হিসেবে গুরুত্ব ফিরে পেয়েছে।

ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রতি ট্রয় আউন্স স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ডলার ছাড়িয়েছে, যা গত দেড় বছরে প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি নির্দেশ করে।

বিশ্ব স্বর্ণ পরিষদের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বিশেষ করে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো, চীন, ভারত, তুরস্ক ও পোল্যান্ড, বৃহৎ পরিসরে স্বর্ণ কিনছে।

ফেব্রুয়ারির পর মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর থেকে চীন, পোল্যান্ড, চেক প্রজাতন্ত্র ও উজবেকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ধারাবাহিকভাবে তাদের রিজার্ভে স্বর্ণ যোগ করছে। মার্চ মাসে চীন ও গুয়াতেমালার রেকর্ড পরিমাণ ক্রয় এই প্রবণতাকে আরও স্পষ্ট করেছে।

পোল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর অ্যাডাম গ্লাপিনস্কি বলেন, বর্তমান বিশ্বে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার চেয়ে অস্থিতিশীলতাই এখন বাস্তবতা।

তার ভাষায়, স্বর্ণ এমন একটি সম্পদ যা কোনো দেশের দায় বা মুদ্রার ওপর নির্ভরশীল নয় এবং সংকটকালে নগদ সক্ষমতা বজায় রাখতে সহায়ক।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ২০২২ সালে রাশিয়ার বৈদেশিক রিজার্ভ জব্দ হওয়ার ঘটনা একটি মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার আটকে যাওয়ার পর অনেক দেশই বুঝতে পারে, বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ রাজনৈতিক ঝুঁকির বাইরে নয়।

ফলে স্বর্ণের মতো ভৌত সম্পদের দিকে ঝোঁক বাড়ে, যা সহজে জব্দ বা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।

অন্যদিকে, তুরস্কের মতো দেশগুলো আবার উল্টো পথে হাঁটতে বাধ্য হয়েছে। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও লিরার মান ধরে রাখতে দেশটি ১২০ টনের বেশি স্বর্ণ বিক্রি বা লিজ দিয়েছে। অর্থাৎ, স্বর্ণ এখন শুধু সঞ্চয়ের মাধ্যম নয়, বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সক্রিয় হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে।

সত্তরের দশকের পর স্বর্ণের গুরুত্ব কিছুটা কমে গেলেও ২০১০ সালের পর থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো আবার বড় পরিসরে এটি কিনতে শুরু করে। বর্তমানে পোল্যান্ড তাদের মজুত ৫৪০ টন থেকে ৭০০ টনে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। একইভাবে চেক প্রজাতন্ত্র ১০ টন থেকে বাড়িয়ে ১০০ টনে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

এইচএসবিসি ও সেন্ট্রাল ব্যাংকিং পাবলিকেশন্সের এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগামী বছরেও স্বর্ণ মজুত বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, চলতি বছর শেষে স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ২৫০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

সব মিলিয়ে স্পষ্ট হচ্ছে, অনিশ্চিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় দেশগুলো এখন ডলারের একক আধিপত্য থেকে সরে এসে স্বর্ণকে বিকল্প নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নিচ্ছে।

এটি শুধু অর্থনৈতিক কৌশল নয়, বরং ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলার একটি সুদূরপ্রসারী প্রস্তুতিও বটে।