চাল-ডাল-তেলের দামে অস্বস্তি, বাজেট নিয়ে উদ্বেগ

সিন্ডিকেট ও ব্যয় বৃদ্ধিকে দায়ী করছেন বিক্রেতারা সাধারণ মানুষের।
টুইট প্রতিবেদক: ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ঘোষিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রধান প্রত্যাশা ছিল নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে স্বস্তি ফিরবে। তবে রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বাজেটের অঙ্ক বা ঘোষণার চেয়ে ক্রেতা-বিক্রেতাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে চাল, ডাল, তেল, ডিম ও অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে থাকবে কি না।
বৃহস্পতিবার কেরানীগঞ্জের বউবাজার, হাতিরপুল, নয়াবাজার ও কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন খুচরা বাজারে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে বড় আকারের বাজেট সাধারণ মানুষের কাছে তেমন অর্থবহ হয়ে উঠছে না।
কারওয়ান বাজারের মুদি ব্যবসায়ী ইমাম উদ্দিন বাবলু বলেন, বাজেটে নতুন কর বা শুল্ক আরোপ না হলেও বাজারে সক্রিয় অসাধু সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সাধারণ মানুষ কোনো সুফল পাবে না। তার ভাষায়, অধিকাংশ ভোগ্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী এবং বাজারে এর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ দেখা যাচ্ছে না।
আরেক ব্যবসায়ী আজমত উল্লাহ বলেন, বাজেট ঘোষণার আগেই চাল, ডাল, ভোজ্যতেল ও আমদানিনির্ভর প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। ফলে নতুন কর আরোপ করা হোক বা না হোক, বাজারে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব সীমিত হতে পারে।
ব্যবসায়ীদের মতে, পরিবহন ব্যয়, জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পাইকারি পর্যায়ে পণ্যের দাম বেড়েছে। সেই চাপ খুচরা বাজারেও প্রতিফলিত হচ্ছে।
অন্যদিকে ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে ক্ষোভ ও হতাশা। বেসরকারি চাকরিজীবী উজ্জ্বল বকত বলেন, বাজার পরিস্থিতিতে পারিবারিক ব্যয় সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বাজেটের পর বাস্তবে নিত্যপণ্যের দাম কমবে কি না, সেটিই সাধারণ মানুষের প্রধান উদ্বেগ।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কামাল হোসেন আকাশ জানান, মাসিক ৩০ হাজার টাকার আয়ে পাঁচ সদস্যের পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করতে গিয়ে তাকে প্রতি মাসে অতিরিক্ত ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা জোগাড় করতে হচ্ছে। সঞ্চয় ভেঙে কিংবা ঋণ নিয়ে সংসার চালাতে হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তেজতুরি বাজার এলাকার গৃহিণী তাসলিমা বলেন, আগে যে অর্থে পূর্ণ বাজার করা যেত, এখন সেই অর্থে অর্ধেক প্রয়োজনও পূরণ হয় না। বাজেটকে কেন্দ্র করে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে তার।
খুচরা বিক্রেতা নাজির হোসেন বলেন, পাইকারি বাজারে বেশি দামে পণ্য কিনতে হওয়ায় খুচরা পর্যায়েও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে বিক্রেতাদেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ঈদের আগের সময়ের তুলনায় বিভিন্ন ধরনের চালের দাম বেড়েছে। পাইকারি পর্যায়ে বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। মিনিকেট, আটাশ ও পোলাও চালের দামও মানভেদে কেজিপ্রতি কয়েক টাকা থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। মাছ ও মুরগির দামেও ঊর্ধ্বগতি রয়েছে। তবে সরবরাহ বাড়ায় অনেক সবজির দাম কমেছে।
জনতা রাইস এজেন্সির রাসেল মিয়া বলেন, ধানের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে মিলমালিকরা চালের দাম বাড়িয়েছেন, যার প্রভাব পুরো বাজারে পড়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বাজেট ঘোষণার পর অনেক সময় মনস্তাত্ত্বিক কারণেও বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয় এবং অসাধু ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ নেয়। কার্যকর বাজার তদারকি ও সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা না গেলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের বলেন, জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব ইতোমধ্যে বাজারে পড়েছে। বাজেটে কিছু পণ্যের কর ও শুল্ক কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তার সুফল সাধারণ ভোক্তার কাছে পৌঁছাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বাজার তদারকিতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর ভূমিকার অভাব অসাধু ব্যবসায়ীদের সুযোগ করে দিচ্ছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যেতে পারে।
বিশ্লেষকদের অভিমত, প্রস্তাবিত বাজেটের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ে বাজার ব্যবস্থাপনা, মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং ভোক্তা স্বার্থ সুরক্ষায় সরকারের কার্যকর বাস্তবায়ন সক্ষমতার ওপর।






