সুন্দরবনে ৯ প্রজাতির মাছ বাড়ছে, কমছে ৬টির মজুদ

মিঠাপানির প্রবাহ বাড়ায় কয়েকটি প্রজাতির মাছের প্রাচুর্য বেড়েছে। তবে অবৈধ শিকার, বিষ দিয়ে মাছ ধরা ও পোনা আহরণে হুমকিতে জলজসম্পদ। গবেষণায় নতুন সাত প্রজাতির মাছ ও দুই প্রজাতির চিংড়ির সন্ধান।

টুইট প্রতিবেদক: বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে মাছের মজুদের চিত্রে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। মিঠাপানির প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় নয় প্রজাতির মাছ ও চিংড়ির মজুদ বাড়তির দিকে থাকলেও ছয় প্রজাতির জলজসম্পদের মজুদ কমছে। অবৈধভাবে মাছ আহরণ, ছোট পোনা ধরা এবং পরিবেশগত প্রতিকূলতাকে এ সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন গবেষকরা।

প্রায় দুই বছর ধরে পরিচালিত ‘সুন্দরবনের জলজসম্পদের মূল্যায়ন’ শীর্ষক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. এম এনামুল হকের নেতৃত্বে নয় সদস্যের একটি গবেষক দল এ সমীক্ষা পরিচালনা করে।

গবেষণায় দেখা গেছে, অলুয়া বা আমাদি, পারশে, ভেটকি, পোয়া, দাতিনা, গ্যাগড়া টেংরা, পাঙ্গাস, হরিণা চিংড়ি ও চাকা চিংড়ির মজুদ বাড়ছে।

অন্যদিকে পায়রা বা চিত্রা, নোনা টেংরা, কাইন মাগুর, গলদা চিংড়ি, বাগদা চিংড়ি ও শীলা কাঁকড়ার মজুদ কমতির দিকে। এসব প্রজাতি রক্ষায় মাছ আহরণ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রজনন মৌসুমে বিশেষ বিধিনিষেধ আরোপের সুপারিশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

গবেষণা দলের প্রধান ড. এনামুল হক জানান, সুন্দরবনে আগে বড় আকারের মাছের প্রাচুর্য বেশি থাকলেও বর্তমানে ছোট আকারের কয়েকটি প্রজাতির উপস্থিতি তুলনামূলক বাড়ছে। মাছের বর্তমান অবস্থা, মজুদের পরিমাণ, ঝুঁকি এবং ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নির্ধারণই ছিল গবেষণার মূল উদ্দেশ্য।

নতুন সাত প্রজাতির মাছের সন্ধান

গবেষণায় সুন্দরবনে আগে নথিভুক্ত হয়নি এমন সাত প্রজাতির মাছ শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ প্রজাতির মাছ ও দুই প্রজাতির চিংড়ি রয়েছে।

নতুন শনাক্ত মাছের মধ্যে রয়েছে এক ঠোঁটা, কুলি বেলে, সবুজ বাইল বা ফোঁটা বেলে, ফোঁটা বাট ও বড় আইশ পারশে। নতুন দুই প্রজাতির চিংড়ি হলো মাকড়সা চিংড়ি ও ফোঁটা চিংড়ি।

গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, দুই বছরের সমীক্ষায় প্রায় ২৬১ প্রজাতির মাছ পাওয়া গেছে। আগের গবেষণার তথ্য যুক্ত করে সুন্দরবনে মোট মাছের প্রজাতির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৮২।

বিষ দিয়ে মাছ ধরা বড় হুমকি

বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের জলজসম্পদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকিগুলোর একটি হলো খাল ও নদীতে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার। পাশাপাশি ছোট পোনা ও রেণু সংগ্রহের কারণে বিপুলসংখ্যক অন্যান্য জলজ প্রাণীও মারা যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘের সাবেক আঞ্চলিক পরিচালক ড. মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবিকা ও অর্থনীতির জন্য মাছ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই অবৈধ শিকার, বিষ প্রয়োগ এবং ছোট পোনা আহরণ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, মাছের উৎপাদন বাড়াতে প্রজাতিগুলোর প্রজননের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং অবৈধ আহরণ বন্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা জরুরি।

গবেষণায় সাতক্ষীরা অঞ্চলে ভেটকি, খুলনা ও শরণখোলায় পাঙ্গাস এবং শরণখোলায় গ্যাগড়া টেংরা মাছের ওপর অতিরিক্ত আহরণের চাপ চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় আহরণের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ, প্রজনন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞা এবং ছোট মাছ রক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

সুপারিশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ

বন অধিদপ্তরের বন সংরক্ষক (খুলনা অঞ্চল) ইমরান আহমেদ জানিয়েছেন, সুন্দরবনের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় নিয়মিত তদারকি চলছে। গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশের আগে একটি চূড়ান্ত কর্মশালা আয়োজন করা হবে।

গবেষণায় উঠে আসা সুপারিশগুলো সরকারের কাছে উপস্থাপন করা হবে। পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গবেষকদের মূল্যায়নে, সামগ্রিকভাবে সুন্দরবনের মাছের অবস্থা এখনো সন্তোষজনক। তবে মানবসৃষ্ট চাপ, জলবায়ু পরিবর্তন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং মিঠাপানির প্রবাহের পরিবর্তন ভবিষ্যতে জলজসম্পদের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের মৎস্যসম্পদ রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতির অস্তিত্ব ও প্রজননব্যবস্থা আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তাই অবৈধ মাছ শিকার বন্ধ, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং বিজ্ঞানভিত্তিক আহরণ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।