কক্সবাজার সৈকতে লাখো মানুষের ভিড়, বিসর্জন ২০০ প্রতিমা

উপকূলজুড়ে ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি ও ভক্তদের জয়ধ্বনি; ধর্মীয় সম্প্রীতির মিলনমেলায় পরিণত হয় সমুদ্রসৈকত।

টুইট প্রতিবেদক: দেবী দুর্গাকে বিদায় জানাতে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে জড়ো হয়েছিলেন লাখো মানুষ। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি আর ভক্তদের জয়ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো সৈকত। একে একে সমুদ্রের জলে বিসর্জন দেওয়া হয় ২০০টির বেশি প্রতিমা। বিদায়ের বেদনা আর উৎসবের আনন্দে মুখর এই আয়োজন পরিণত হয় বিভিন্ন ধর্মের মানুষের সম্প্রীতির মিলনমেলায়।

বুধবার (২১ অক্টোবর) বিজয়া দশমীতে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের লাবণী পয়েন্টে শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে এমন দৃশ্যের অবতারণা হয়। কক্সবাজার জেলা ছাড়াও বান্দরবান ও নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে প্রতিমা নিয়ে আসেন ভক্তরা।

সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে আয়োজন

আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, এবারের বিসর্জন অনুষ্ঠানে ২০০টির বেশি প্রতিমা সমুদ্রে বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। বিকেল ৩টার দিকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সম্প্রীতি সমাবেশের মধ্য দিয়ে শুরু হয় আনুষ্ঠানিকতা।

সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। তিনি বলেন, সারা দেশে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই দুর্গাপূজা সম্পন্ন হয়েছে। এ আয়োজন দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও নিরাপত্তার ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরে।

অনুষ্ঠানে জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা বক্তব্য দেন। বক্তারা বলেন, কক্সবাজারের দুর্গোৎসব শুধু একটি ধর্মীয় আয়োজন নয়; এটি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য জোরদারেরও একটি উপলক্ষ।

সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি উদয় শংকর পাল মিঠু। এ সময় কক্সবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী, কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল, সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য শামীম আরা স্বপ্না, জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান, পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান, পর্যটন পুলিশের পুলিশ সুপার নিশাদ এঞ্জেলা এবং হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি দোলন ধরসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

বিদায়ের বেদনায় অশ্রুসজল ভক্তরা

সমাবেশ শেষে বিকেল ৫টার পর শুরু হয় প্রতিমা বিসর্জন। একে একে সমুদ্রের লোনাজলে প্রতিমা বিসর্জন দেন ভক্তরা। ঢাকের বাদ্য আর ঢেউয়ের গর্জনের মধ্যে দেবীকে বিদায় জানানোর সময় অনেক ভক্তের চোখে দেখা যায় অশ্রু। আবার জয়ধ্বনি ও উৎসবের উচ্ছ্বাসেও মুখর ছিল সৈকত।

কক্সবাজার শহরের গোলদীঘিরপাড় এলাকার বাসিন্দা রিতা রাণী পাল বলেন, ‘মা দুর্গার বিদায়কে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। দুর্গা মায়ের জন্য আবার আরেকটি বছর অপেক্ষা করতে হবে।’

পরিবার নিয়ে ঢাকার উত্তরা থেকে কক্সবাজারে বেড়াতে আসা এনামুল হক বলেন, এত বড় আয়োজন আগে কখনো দেখেননি। এখানে এসে তাঁর ভালো লেগেছে। ছুটির আনন্দ জনসমুদ্রের এই উৎসবে যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পেয়েছে বলেও জানান তিনি।

নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা

বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম ঘিরে সৈকত ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করে জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিসর্জন নির্বিঘ্ন করা এবং দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নেওয়া হয় বিশেষ সমন্বিত পদক্ষেপ।

জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর কক্সবাজার জেলার ৩২৪টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৫৪টি মণ্ডপে প্রতিমা পূজা এবং ১৭০টিতে ঘট পূজার আয়োজন ছিল। গত বছরের তুলনায় এবার পূজামণ্ডপের সংখ্যা বেড়েছে ছয়টি।

সব মিলিয়ে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের প্রতিমা বিসর্জন পরিণত হয় ধর্মীয় আবেগ, উৎসবের আনন্দ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক বৃহৎ আয়োজনে। দেবী দুর্গাকে বিদায় জানিয়ে আগামী বছরের অপেক্ষায় ফিরেছেন ভক্তরা।