ইশরাককে কেন মাঠে নামতে হলো? মাদক ব্যবসা চলল কীভাব!

গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযান, অস্ত্র প্রদর্শন ও পদত্যাগের ঘোষণা ঘিরে বিতর্ক; প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন।

বিশেষ প্রতিবেদন: রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের অস্ত্র হাতে উপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক চলছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসার অভিযোগ, সেখানে অপরাধ দমনের দায়িত্বে থাকা প্রশাসন আগে কী করেছে?

অভিযানে কী ঘটেছিল

শনিবার (১৭ অক্টোবর ২০২৬) গেন্ডারিয়া রেললাইনসংলগ্ন দয়াগঞ্জ ঘুণ্টিঘর রেলগেট ও ৪৫ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় ইশরাক হোসেন মাদকবিরোধী অভিযান চালান। অভিযানে পুলিশ, স্বেচ্ছাসেবী ও স্থানীয়রা অংশ নেন। চার-পাঁচটি অবৈধ বা অস্থায়ী মাদকের আস্তানা উচ্ছেদ করা হয়। সেখান থেকে হেরোইন বা হেরোইনজাতীয় সন্দেহভাজন মাদক, বিদেশি মদ, মাদক সেবনের সরঞ্জাম, দেশীয় ধারালো অস্ত্র, নগদ টাকা ও ছিনতাই করা হয়েছে বলে সন্দেহ করা মোবাইল ফোন জব্দের তথ্য আসে। মাদক কারবারে জড়িত সন্দেহে ছয়জনকে আটক করে গেন্ডারিয়া থানায় হস্তান্তর করা হয়।

অপরাধীর বিচার যেমন চাই, তেমনি দায়িত্বে অবহেলা থাকলে তারও জবাব চাই। মাদক নির্মূল হোক আইনের শাসন, কার্যকর প্রশাসন ও স্বচ্ছ জবাবদিহির মাধ্যমে।

ইশরাকের ফেসবুকে প্রকাশিত ‘ইশরাকের অ্যাকশন: মাদক আস্তানা গুঁড়িয়ে বিক্রেতাদের পুলিশে সোপর্দ’ শীর্ষক ভিডিওতে তাঁকে এক হাতে হ্যান্ডমাইক ও অন্য হাতে পিস্তল নিয়ে ‘ধর ধর ধর’ বলে চিৎকার করতে এবং কয়েকজনকে ধাওয়া করতে দেখা যায়। পাশে থাকা কয়েকজনের হাতেও অস্ত্র ছিল। এক দেহরক্ষীকে এক তরুণকে লাথি মারতে দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ভিডিওর কিছু অংশে অস্ত্র ঝাপসা করা হলেও অন্য অংশে তা স্পষ্ট ছিল। পরে ভিডিওটি সাময়িকভাবে সরানো বা ঝাপসা করার তথ্যও প্রকাশিত হয়।

ইশরাকের ব্যাখ্যা

১৮ অক্টোবর ইশরাক দাবি করেন, অস্ত্রটি তাঁর ব্যক্তিগত লাইসেন্সকৃত ও বৈধ। গেন্ডারিয়া, ঘণ্টিঘর, মুন্সিটেক, করাতিটোলাসহ আশপাশে মাদক ব্যবসা এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাদকের বিস্তার নিয়ে স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের অভিযোগের ভিত্তিতে তিনি অভিযানে যান।

তাঁর দাবি, পুলিশকে আগে জানানো হলেও তারা দেরিতে পৌঁছায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নিজস্ব গোয়েন্দা সূত্র থেকে ছাদে গুলির আশঙ্কাসহ নিরাপত্তাঝুঁকির সতর্কবার্তাও পেয়েছিলেন।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ৩০-৩৫ জন মারমুখী ব্যক্তি গাড়িবহরের দিকে এগিয়ে এলে আত্মরক্ষা ও জানমালের নিরাপত্তায় তিনি এবং সরকারি নিরাপত্তারক্ষীরা অল্প সময়ের জন্য অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে অস্ত্র নামিয়ে রাখা হয়। তিনি দাবি করেন, গুলি চালাননি বা কাউকে ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন করেননি। মাদক কারবারি যে দলেরই হোক, এমনকি নিজের দলের কেউ জড়িত থাকলেও ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানান তিনি।

পুলিশের বক্তব্য ও আইনি প্রশ্ন

গেন্ডারিয়া থানার ওসি মনিরুজ্জামান মনির জানান, ইশরাক ছয়জনকে আটক করার পর থানায় ফোন দেন এবং পরে তাঁদের হস্তান্তর করেন। কিছু পাউডারজাতীয় পদার্থ পরীক্ষাধীন রয়েছে। ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান শফিকুল ইসলাম জানান, ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আইনের ব্যত্যয় প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পুলিশের কিছু বক্তব্যে বলা হয়, অভিযান সম্পর্কে তারা আগে সম্পূর্ণ অবহিত ছিল না বা পরে জানতে পেরেছে। অন্যদিকে ইশরাক দাবি করেছেন, পুলিশকে আগেই জানানো হয়েছিল। গেন্ডারিয়া থানা নিয়মিত মাসে আট থেকে দশটি অভিযান এবং প্রায় ১৫০-২০০ জনকে গ্রেপ্তারের দাবি করেছে। তবে এ পরিসংখ্যানের সময়সীমা, মামলা ও পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ যাচাই করা প্রয়োজন।

২০২৫ সালের আগ্নেয়াস্ত্র নীতিমালার প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, লাইসেন্সপ্রাপ্ত অস্ত্র আত্মরক্ষার প্রয়োজনে বহন বা ব্যবহার করা গেলেও অন্যের মনে ভয় বা বিরক্তি সৃষ্টিকারীভাবে প্রদর্শনের বিধিনিষেধ রয়েছে। আইনজ্ঞদের মতে, মাদক দমন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মূল দায়িত্ব পুলিশের; জনপ্রতিনিধি বা প্রতিমন্ত্রীর সরাসরি এভাবে অভিযানে নামার আইনি ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তাই অস্ত্র প্রদর্শনের বৈধতা, আত্মরক্ষার দাবি এবং অভিযানের পদ্ধতি পৃথকভাবে তদন্ত করা জরুরি।

পদত্যাগের নির্দেশ ও ইশরাকের ঘোষণা

১৮ অক্টোবর রাতে সরকার-সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের সূত্রের বরাতে খবর ছড়ায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইশরাককে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন। মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর তাঁকে ডেকে পাঠানোর খবরও আসে এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনে এ-সংক্রান্ত স্ক্রল প্রচারের তথ্য প্রকাশিত হয়। তবে ইশরাকের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে খবরটিকে অসত্য বা বিভ্রান্তিকর বলা হয়।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) সকালে নিজের ফেসবুক পোস্টে ইশরাক জানান, দুপুর ২টায় জাতীয় প্রেসক্লাবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের চূড়ান্ত ঘোষণা দেবেন এবং সাংবাদিকদের মুখোমুখি হবেন। পোস্টে লেখেন, “মন্ত্রী নয়, মাদক নির্মূল! মাদক নির্মূল, মাদক নির্মূল!” ঘোষণার পর পদত্যাগপত্র জমা ও গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

প্রশাসন আগে কোথায় ছিল

মূল প্রশ্নটি হলো—সংশ্লিষ্ট এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসার অভিযোগ থাকলে আগে কতবার অভিযান হয়েছে, কারা গ্রেপ্তার হয়েছে, কতটি মামলা হয়েছে এবং অভিযান সত্ত্বেও মাদক ব্যবসার অভিযোগ কেন অব্যাহত রয়েছে?

পুলিশের দাবি করা অভিযান ও গ্রেপ্তারের পরিসংখ্যানের পাশাপাশি মাদকের সরবরাহব্যবস্থা, মামলার অগ্রগতি এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে নেওয়া পরবর্তী পদক্ষেপের তথ্য প্রকাশ করা দরকার। ইশরাকের দাবি অনুযায়ী পুলিশকে আগে জানানো হয়েছিল কি না, নিরাপত্তাঝুঁকির সতর্কবার্তা কী ছিল এবং পুলিশ পৌঁছাতে দেরি করেছিল কি না—এসবও যাচাই করতে হবে।

একই সঙ্গে জব্দ করা পদার্থের পরীক্ষার ফল, আটক ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা, ভিডিওতে দেখা অস্ত্র প্রদর্শন ও দেহরক্ষীর আচরণ এবং অভিযানের আইনগত বৈধতা তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। মাদকবিরোধী উদ্যোগ যৌক্তিক হলেও তার প্রতিটি পদ্ধতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইনসম্মত হয়ে যায় না। আবার অস্ত্র প্রদর্শন নিয়ে বিতর্কের কারণে মাদক ব্যবসা ও প্রশাসনের ভূমিকার প্রশ্নও আড়াল করা যায় না।

প্রশাসন যদি নিয়মিত ও কার্যকরভাবে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করত, তাহলে জনপ্রতিনিধিদের এভাবে সরাসরি মাঠে নামার প্রয়োজন কতটা থাকত? এর উত্তর দিতে সংশ্লিষ্ট এলাকার আগের অভিযোগ, অভিযান, গ্রেপ্তার, মামলা ও আইনগত পদক্ষেপের তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।

ইশরাকের কর্মকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। আইন লঙ্ঘন হয়ে থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। একই সঙ্গে প্রশাসনের দায়িত্বে অবহেলা থাকলে তারও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হোক।

মাদক দমনের দায়িত্ব প্রশাসনের; জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব প্রশাসনকে সক্রিয় করা। কেউ আইন নিজের হাতে নিতে পারেন না, আবার প্রশাসনও দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারে না। অপরাধীর বিচার যেমন চাই, তেমনি দায়িত্বে অবহেলা থাকলে তারও জবাব চাই।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, বিবিসি বাংলা, ইত্তেফাক, যুগান্তর, ঢাকা টাইমস, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (টিবিএস), জাগো নিউজসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং ইশরাক হোসেনের বক্তব্য ও ফেসবুক পোস্ট।