ইশরাকের অস্ত্রকাণ্ডে তোলপাড়, পদত্যাগের খবর নিয়ে ধোঁয়াশা

অস্ত্র হাতে অভিযানে ইশরাক, পদত্যাগের নির্দেশের খবর নিয়ে বিতর্ক। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন বলে একাধিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদন; খবরটি অস্বীকার করেছে প্রতিমন্ত্রীর দপ্তর, অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনা তদন্ত করছে ডিএমপি।

টুইট ডেস্ক: রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন করে বিতর্কের মুখে পড়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন। এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন বলে একাধিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।

তবে প্রতিমন্ত্রীর দপ্তর এ খবরকে অসত্য ও ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। অন্যদিকে, অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনায় আইন লঙ্ঘন হয়েছে কি না, তা তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।

গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে অস্ত্র প্রদর্শন


গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনসংলগ্ন দয়াগঞ্জ গুন্টিঘর রেলগেট এলাকায় মাদকবিরোধী কর্মসূচিতে অংশ নেন ইশরাক হোসেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে তাঁকে হাতে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে চিৎকার করতে দেখা যায়। তাঁর সঙ্গে থাকা কয়েকজনের হাতেও অস্ত্র দেখা যায়।

ভিডিওতে প্রতিমন্ত্রীর নিরাপত্তারক্ষীদের কয়েকজন ব্যক্তির দিকে এগিয়ে যেতে দেখা যায়। একটি দৃশ্যে এক নিরাপত্তারক্ষীকে এক তরুণকে লাথি মারতেও দেখা যায়। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর একজন প্রতিমন্ত্রীর এভাবে অস্ত্র হাতে অভিযানে অংশ নেওয়া নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে সমালোচনা শুরু হয়।

প্রতিমন্ত্রীর দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযানে চার থেকে পাঁচটি অস্থায়ী মাদকের আস্তানা উচ্ছেদ করা হয় এবং ছয়জনকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। অভিযানে মাদকদ্রব্য, অস্ত্র, নগদ অর্থ ও ছিনতাই করা মুঠোফোন উদ্ধারের দাবিও করেছেন ইশরাক। এসব উদ্ধারের তথ্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।

আত্মরক্ষার যুক্তি ইশরাকের

রোববার (১৮ অক্টোবর) দেওয়া বিবৃতিতে ইশরাক হোসেন দাবি করেন, তাঁর হাতে থাকা আগ্নেয়াস্ত্রটি বৈধ ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত। অভিযানের সময় প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জন ব্যক্তি তাঁদের গাড়িবহরের দিকে মারমুখী ভঙ্গিতে এগিয়ে আসেন বলে দাবি করেন তিনি। সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় আত্মরক্ষার জন্য স্বল্প সময়ের জন্য অস্ত্র উঁচিয়ে ধরা হয়েছিল এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে অস্ত্র সরিয়ে নেওয়া হয় বলে তাঁর বক্তব্য।

তিনি দাবি করেন, কাউকে ভয় দেখানো বা গুলি চালানো তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না। তবে অস্ত্রের লাইসেন্স থাকা সত্ত্বেও প্রকাশ্যে এভাবে অস্ত্র প্রদর্শন আইনসম্মত ছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনা তদন্ত করছে ডিএমপি

ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, ঘটনাটি তদন্তের দায়িত্ব ওয়ারী বিভাগের উপকমিশপারকে দেওয়া হয়েছে। তদন্তে আইনের কোনো ব্যত্যয় পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

অভিযানের আগে পুলিশের সঙ্গে যথাযথ সমন্বয় করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশের পক্ষ থেকে আগে জানানো হয়েছিল, অভিযান সম্পর্কে তারা আগাম অবহিত ছিল না। অন্যদিকে, ইশরাকের বক্তব্যে অভিযানের নিরাপত্তাঝুঁকি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালার ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদ নিয়ে এ ঘটনায় আলোচনা হচ্ছে। নীতিমালার প্রাসঙ্গিক বিধান অনুযায়ী, আত্মরক্ষার জন্য লাইসেন্সপ্রাপ্ত অস্ত্র বহন করা গেলেও অন্যের মনে ভীতি বা বিরক্তি সৃষ্টি করতে পারে—এমনভাবে অস্ত্র প্রদর্শনের প্রশ্ন রয়েছে।

পদত্যাগের নির্দেশের খবর, অস্বীকার প্রতিমন্ত্রীর দপ্তরের

রোববার সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইশরাক হোসেনকে ডেকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন বলে প্রথম আলো, যুগান্তরসহ একাধিক গণমাধ্যম সরকার-সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের সূত্রের বরাতে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

তবে এ বিষয়ে সরকারের কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে পাওয়া যায়নি। ইশরাক হোসেনের প্রেস কর্মকর্তা মাহফুজ কবির মুক্তা পদত্যাগের নির্দেশের খবরকে অসত্য, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর দপ্তরের দাবি, সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে এ ধরনের কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।

ইশরাকও এ খবরকে গুজব বলে উল্লেখ করেছেন। দল থেকে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা জানানো হবে বলে তাঁর বক্তব্যের কথা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

রাজনৈতিক অঙ্গনে অস্বস্তি

ঘটনাটি নিয়ে বিএনপি ও সরকার-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মাদকবিরোধী উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেও একজন প্রতিমন্ত্রীর সরাসরি অস্ত্র হাতে অভিযানে অংশ নেওয়ার পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সমালোচকেরা।

তবে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য থাকায় বিষয়টি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিষ্পত্তি হয়নি। একই সঙ্গে অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনায় তদন্তের ফলও প্রকাশিত হয়নি।

১৯ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত পাওয়া প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ইশরাক হোসেনকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার খবর একাধিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও তাঁর দপ্তর তা অস্বীকার করেছে। সরকারের আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ এবং ডিএমপির তদন্তের ফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টিকে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়।