কর্ণফুলী টানেলের লোকসান তদন্তে সংসদীয় কমিটি

সম্ভাব্যতা যাচাই থেকে বাস্তবায়ন, সব পর্যায়ের অনিয়ম ও লোকসানের কারণ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে ২২১ শূন্য পদ পূরণেও নির্দেশনা
টুইট প্রতিবেদক: দেশের আলোচিত মেগা প্রকল্প কর্ণফুলী টানেলের বিপুল আর্থিক লোকসানের কারণ অনুসন্ধানে বিস্তারিত তদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় সংসদের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। প্রকল্পটির প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাই, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এবং বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে লোকসানের নেপথ্যের কারণ খুঁজে বের করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের শূন্য পদগুলোতে নিয়োগ দ্রুত সম্পন্ন করা এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
১ হাজার ১৫৩ প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা
।
অসংসদ সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন চলমান ১ হাজার ১৫৩টি প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ তালিকা কমিটির সদস্যদের সামনে উপস্থাপন করা হয়। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলপত্রের পাশাপাশি বর্তমান অগ্রগতি ও কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এ ছাড়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের ২৫৬টি প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর কারণ ব্যাখ্যা করে মন্ত্রণালয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের পেছনে ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতা, আমদানিনির্ভরতা, সময়মতো প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ না হওয়া এবং যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই কাজ শুরুর মতো বিষয় চিহ্নিত করা হয়।
সময়ে অর্থ ছাড় না হওয়া এবং একাধিক মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়হীনতাকেও প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। এসব সমস্যা কাটিয়ে উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি।
প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে নতুন নীতিমালা
প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে বিদ্যমান জটিলতা দূর করতে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে বৈঠকে জানানো হয়। নীতিমালাটি চূড়ান্ত হলে প্রকল্প পরিচালক নির্বাচন ও পদায়নের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়।
একই সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য দূর করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়। দেশের সব অঞ্চলে ন্যায্যতার ভিত্তিতে উন্নয়ন নিশ্চিত করার পাশাপাশি গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ নজর দেওয়ার কথা জানানো হয়।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে ২২১ শূন্য পদ
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়াতে জনবল নিয়োগের বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পায়। বর্তমানে মন্ত্রণালয়ের ২২১টি পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন গ্রেডে ৬৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানানো হয়।
কমিটির সভাপতি নির্দেশনা দেন, নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু শূন্য পদ পূরণ করলেই হবে না; মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজন ও কাজের ধরন বিবেচনায় কর্মভার নির্ধারণ করে অগ্রাধিকার
ভিত্তিতে নিয়োগ সম্পন্ন করতে হবে।
কর্ণফুলী টানেলের লোকসানের কারণ অনুসন্ধান
বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় ছিল কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের আর্থিক লোকসান। প্রকল্পটির প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাই, বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপ এবং বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন কমিটির সদস্যরা।
লোকসানের প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করতে পরবর্তী বৈঠকে বিষয়টি আরও বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্পের সামগ্রিক বাস্তবায়নপ্রক্রিয়া ও আর্থিক ক্ষতির কারণ অনুসন্ধানে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করার বিষয়ে কমিটির সদস্যরা একমত হন।
তদন্তের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সংসদীয় কমিটিকে পূর্ণ সহযোগিতা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন যারা
জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কমিটির সদস্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, কাজী রফিকুল ইসলাম, মঈনুল ইসলাম খান, মো. সাইফুল আলম এবং মো. রাশেদুল ইসলাম রাশেদ অংশ নেন।
এ ছাড়া পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য, পরিকল্পনা বিভাগ এবং পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব, মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রধান এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
কর্ণফুলী টানেলের লোকসান তদন্তের সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে প্রকল্পটির পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ সামনে এসেছে। তবে লোকসানের প্রকৃত কারণ নির্ধারণে তদন্তের ফলাফল এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের পর্যালোচনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।






