আইএমএফের নতুন ঋণে কঠিন শর্তের মুখে বাংলাদেশ

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার সংকট মোকাবিলায় নতুন অর্থায়নের খোঁজে সরকার; ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সম্মেলনে গুরুত্ব পাবে ঋণ ও সংস্কার আলোচনা।
টুইট প্রতিবেদক: বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি কঠিন সময় পার করছে। এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নতুন ঋণ সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের ২০২৬ সালের বার্ষিক সম্মেলনে।
থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় এ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল অংশ নিচ্ছে। নতুন ঋণ সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নতুন ঋণ ও বিকল্প অর্থায়নের সন্ধানে সরকার
আইএমএফের আগের ঋণ কর্মসূচির কিছু শর্ত নতুন সরকারের অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় বাংলাদেশ বিকল্প অর্থায়ন ও নিজস্ব সংস্কার কৌশলের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। পুঁজিবাজার ও বন্ডবাজারের বিকাশ, অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা, বন্ধ শিল্পকারখানা সচল করা এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করাও এ কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে নতুন অর্থায়ন নিশ্চিত করতে আইএমএফের সঙ্গে সমঝোতা কতটা এগোয়, তার ওপর অর্থনৈতিক পরিকল্পনার বাস্তবায়ন অনেকাংশে নির্ভর করছে।
সম্মেলনের আলোচনায় যুদ্ধ, জ্বালানি ও ঋণসংকট
বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের প্রভাব, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চ সুদহার ও ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা এবারের সম্মেলনের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয়। জ্বালানি তেল ও সারের দাম বাড়ায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক চাপ আরও তীব্র হচ্ছে। সম্ভাব্য জলবায়ুগত ঝুঁকিও খাদ্যনিরাপত্তা ও উৎপাদনব্যবস্থার ওপর নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে।
সম্মেলনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো কীভাবে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
কর আদায় ও ব্যাংক খাতে সংস্কারের চাপ
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম দুর্বলতা হলো রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতা। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত তুলনামূলকভাবে কম। এ কারণে করের আওতা বাড়ানো, কর অব্যাহতি যৌক্তিক করা এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না বাড়িয়ে নতুন করদাতা শনাক্ত করা এবং কর ফাঁকি বন্ধ করা। কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির কারণে ঋণের ব্যয় বেড়েছে। নীতি সুদহার ১০ শতাংশের ওপরে ওঠা এবং ঋণের সুদহার বাজারভিত্তিক হওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যে অর্থায়নের খরচ বেড়েছে। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চললেও বিনিয়োগ ও উৎপাদন সম্প্রসারণে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি ও সুশাসনের দুর্বলতা দূর করা না গেলে দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে এখনো চাপ
বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং রিজার্ভের হিসাব আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ। ডলারের বিনিময় হার নির্ধারণে বাজারভিত্তিক ব্যবস্থা চালু এবং রিজার্ভের তথ্য প্রকাশের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
এসব পদক্ষেপে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা আনার চেষ্টা চললেও রিজার্ভ পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। প্রবাস আয় ও রপ্তানি আয় বাড়ানোর পাশাপাশি রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা এবং প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারি ভর্তুকি কমানোর চাপও রয়েছে। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে জ্বালানির দাম বাড়ানো কিংবা ভর্তুকি কমানোর প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে পড়তে পারে। তাই অর্থনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাও জরুরি।
বাড়তি জ্বালানি ব্যয় বাড়াচ্ছে আর্থিক চাপ
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর ব্যাংককে এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের বাড়তি জ্বালানি ব্যয়ের চিত্র তুলে ধরেছেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানিতে অতিরিক্ত ১৮২ কোটি ডলার, সারে প্রায় ৭ কোটি ডলার এবং জ্বালানি তেলে ২২১ কোটি ডলার ব্যয়ের প্রয়োজন পড়বে।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলো যে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত সেই ক্ষতির দায়ভার ভাগ করে নেওয়া।
জ্বালানি আমদানির বাড়তি ব্যয় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে বাজেট ব্যবস্থাপনা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নয়ন ব্যয় বজায় রাখার ক্ষেত্রেও সরকারকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।
নতুন ঋণের সম্ভাবনা ও শর্ত নিয়ে আলোচনা
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে অতিরিক্ত অর্থায়নের বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা শুরু করেছে। তবে এসব সংস্থা থেকে সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনার অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ব্যাংককের সম্মেলনে অংশ নিচ্ছে। সম্মেলনের ফাঁকে আইএমএফের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা ফিচ রেটিংস, বহুজাতিক ব্যাংক জেপি মরগ্যান, চীনের উপ-অর্থমন্ত্রী লিয়াও মিন, চায়না এক্সিম ব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক অর্থ করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী মাখতার দিওপের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে।
দেশটির আইএমএফের নির্ধারিত কোটার ভিত্তিতে নতুন করে ৪৫০ কোটি থেকে ৫০০ কোটি ডলার পর্যন্ত ঋণ পাওয়ার সম্ভাবনার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ঋণের পরিমাণ, শর্ত ও সময়সীমা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
আগের ঋণ কর্মসূচিতে বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত কিছু শর্ত নতুন সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় নতুন কাঠামোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। প্রস্তাবিত শর্তগুলোর মধ্যে জ্বালানি তেলের ওপর অভ্যন্তরীণ শুল্ক আরোপ, ব্যাংক খাতের মূলধন ঘাটতির বাস্তবসম্মত হিসাব প্রকাশ এবং সরকারি ভর্তুকি কমানোর বিষয় রয়েছে।
এসব শর্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের সামনে দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একদিকে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন নিশ্চিত করতে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে হবে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হওয়া ঠেকাতে হবে।
সামনে কঠিন অর্থনৈতিক সমীকরণ
ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সম্মেলন বাংলাদেশের জন্য নতুন অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে শুধু ঋণ সংগ্রহ করলেই অর্থনৈতিক সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা এবং রপ্তানি আয় বাড়ানোর মতো মৌলিক সংস্কারও জরুরি।
একই সঙ্গে ঋণের শর্ত নির্ধারণে দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা, কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও সামাজিক সুরক্ষার বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পাশাপাশি কার্যকর দেশীয় নীতির সমন্বয় ঘটাতে পারলেই বাংলাদেশের পক্ষে বর্তমান অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা করে টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়া সহজ হবে।






