কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে এলপিজির দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে মজুতের অভিযোগ, ১ হাজার ৫৮৫ টাকার সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে আড়াই হাজারে; আজ নতুন দাম ঘোষণা করবে বিইআরসি
টুইট ডেস্ক: বাজারে গ্যাস সিলিন্ডারের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে এলপিজির দাম বাড়িয়ে বড় ধরনের মুনাফা করার চেষ্টা চলছে বলে দুটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বিষয়টি সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে জানানো হলে শনিবার এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। বৈঠকে বাজারে এলপিজির মজুত ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়।
সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, দেশের চাহিদা অনুযায়ী এলপিজি আমদানি করা হয়েছে। এরপরও বাজারে সংকট কেন তৈরি হয়েছে এবং কেন গ্রাহকদের কাছ থেকে বাড়তি দাম নেওয়া হচ্ছে, তা জানতে এলপিজি ব্যবসায়ীদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়।
তবে এলপিজি অপারেটরদের নেতারা মজুতের অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম বেড়েছে। দেশে দাম কিছুটা বাড়ানো হলে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে।
বৈঠক শেষে জ্বালানিমন্ত্রীর কাছে সাংবাদিকরা এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এর মধ্যেই আজ রোববার বিকেলে অক্টোবর মাসের জন্য এলপিজির নতুন দাম ঘোষণা করার কথা রয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের।
বৈঠকে উপস্থিত একটি সূত্র জানায়, এলপিজি অপারেটররা এক দফায় বড় ধরনের দাম বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাদের দাবি, দাম বাড়ানো হলে আমদানির ক্ষেত্রে সুবিধা হবে। তবে নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী দাম বাড়ানো হচ্ছে না বলে কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন তারা।
জানা গেছে, ২২ সেপ্টেম্বরের পর থেকেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় এলপিজির সংকট তীব্র হয়েছে। সরকারি নির্ধারিত ১ হাজার ৫৮৫ টাকার সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং জাহাজ ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজি আমদানির খরচ কিছুটা বাড়লেও এই সুযোগে কিছু অপারেটর গ্যাস মজুত করে রেখেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কয়েকটি অপারেটর আগেভাগে তাদের ট্যাংকারে এলপিজি মজুত করেছে। আবার কেউ কেউ ৩০ সেপ্টেম্বরের আগে বঙ্গোপসাগরের কাছাকাছি এলাকায় এলপিজিবাহী জাহাজ অপেক্ষমাণ রেখেছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে মজুতের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল। তিনি বলেন, মেঘনা গ্রুপের ফ্রেশ এলপিজি কোনো মজুত করেনি। বরং সেপ্টেম্বরে আগের তুলনায় কম এলপিজি আমদানি করা হয়েছে, যার তথ্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছেও রয়েছে। সংকট কাটাতে আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে আরও বেশি এলপিজি আমদানির চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।
ওমেরা পেট্রোলিয়ামের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরীও এলপিজি মজুতের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ওমেরাসহ কয়েকটি কোম্পানি এলপিজি মজুত করেছে বলে যে খবর প্রকাশ হয়েছে, তা সঠিক নয়। বাজারের সংকট কাটাতে সরবরাহ বাড়ানো প্রয়োজন। তাঁর দাবি, এলপিজির দাম বাড়লে কোম্পানিগুলোরও ক্ষতি হয়, কারণ দাম বেশি হলে গ্রাহকের ব্যবহার কমে যায়।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে প্রতি মাসে দেড় লাখ টনের বেশি এলপিজি ব্যবহার হয়। এর প্রায় ৯৮ শতাংশই বেসরকারি কোম্পানিগুলো আমদানি করে। দেশে প্রায় ২৯টি এলপিজি কোম্পানি সক্রিয় থাকলেও বাজারের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে ১২ থেকে ১৪টি প্রতিষ্ঠান।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে দেশে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ টন এলপিজি আমদানি হয়েছিল। সেপ্টেম্বরে প্রায় একই পরিমাণ এলপিজি দেশে এসেছে। অথচ সরবরাহে সংকট দেখা দেওয়ায় বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দেশের মোট এলপিজি সরবরাহের প্রায় ৬৮ শতাংশ করে চারটি প্রতিষ্ঠান—ওমেরা পেট্রোলিয়াম, পেট্রোমেক্স, মেঘনা ও যমুনা স্পেসটেক। এর মধ্যে বিএম এনার্জি প্রায় ৮ শতাংশ, ইউনাইটেড আইগ্যাজ ৭ শতাংশ এবং ডেল্টা ৪ শতাংশ সরবরাহ করে। জেএমআই ও প্রিমিয়াম এলপিজির সরবরাহ প্রায় ৩ শতাংশ করে।
এদিকে, বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনায় ১০ থেকে ১২টি কোম্পানির কাছে সেপ্টেম্বর মাসের দৈনিক এলপিজি বিক্রি।






