সরকারি হাসপাতালের খাবার: বরাদ্দ কম, পুষ্টি নিয়েও শঙ্কা

পরিমাণে কম ও স্বাদহীন খাবারের অভিযোগ; রোগভেদে খাদ্যতালিকার দাবি বিশেষজ্ঞদের

টুইটের বিশেষ প্রতিবেদন: সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের জন্য বরাদ্দ করা খাবারের মান ও পরিমাণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে নানা অভিযোগ। খাবারের তালিকায় ভাত, ডাল, সবজি, মাছ-মাংস, ডিম, রুটি ও কলা থাকলেও বাস্তবে খাবারের স্বাদ ও পরিমাণ নিয়ে সন্তুষ্ট নন অনেক রোগী। কেউ কেউ হাসপাতালের খাবার খেতে না পেরে স্বজনের কাছ থেকে খাবার আনছেন, আবার অনেকে বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে কিনে খাচ্ছেন।

রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক রোগী জানান, দুপুরে ভাত, ডাল, সবজি ও মাংস দেওয়া হলেও খাবারে স্বাদ নেই। ডাল অনেকটা পানির মতো এবং সবজিও বিস্বাদ। দীর্ঘদিন হাসপাতালে থাকায় মাঝেমধ্যে বাইরে থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে তাঁকে। এতে চিকিৎসার ব্যয়ের সঙ্গে বাড়তি খরচও যুক্ত হচ্ছে।

জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের আরেক রোগীর অভিজ্ঞতাও প্রায় একই। তাঁর অভিযোগ, খাবারের পদ নিয়ে বড় সমস্যা না থাকলেও রান্না করা খাবার স্বাদহীন। ফলে রোগীদের অনেকেই হাসপাতালের খাবার খেতে আগ্রহ হারান।

সরকারি হাসপাতালে রোগীপ্রতি তিন বেলার খাবারের বরাদ্দ বর্তমানে ১৭৫ টাকা। এর মধ্যে ১৫ শতাংশ ভ্যাট বাদ দিলে কার্যকর বরাদ্দ দাঁড়ায় ১৪৮ টাকা ৭৫ পয়সা। ২০০৯ সালে খাবারের বরাদ্দ ছিল ৪৫ টাকা। পরে তা ৭৫ টাকা, ২০১৩ সালে ১২৫ টাকা এবং প্রায় এক দশক পর ২০২২ সালের অক্টোবরে বাড়িয়ে ১৭৫ টাকা করা হয়।

২০১৩ সালের নির্ধারিত ডায়েট স্কেল অনুযায়ী রোগীদের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ রুটি, কলা, চিনি, ডিম, ভাত, মাছ বা মাংস, ডাল ও সবজি দেওয়ার কথা। তবে কাগজে নির্ধারিত পরিমাণের সঙ্গে বাস্তবে রোগীর পাতে কতটা খাবার পৌঁছাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী হাসপাতালগুলো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় রোগীদের খাবারের ব্যবস্থা করে। প্রতিবছর দরপত্রের মাধ্যমে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে খাদ্যসামগ্রী সরবরাহের দায়িত্ব দেওয়া হয়। অঞ্চলভেদে খাদ্যপণ্যের দামের পার্থক্যের কারণে হাসপাতালভেদে দরপত্রের মূল্যও ভিন্ন হতে পারে।

তবে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে নির্ধারিত শয্যার বিপরীতে ডায়েট বরাদ্দ থাকায় অতিরিক্ত রোগী ভর্তি হলে সবাইকে খাবার দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষায়িত হাসপাতালে সাধারণত ভর্তি রোগীর সংখ্যা অনুযায়ী ডায়েট দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন বলেন, দরপত্রের মাধ্যমে খাদ্যসামগ্রী সরবরাহ নেওয়া হয়। হাসপাতালের কর্মীরা সেগুলো রান্না ও বিতরণ করেন। ডায়েট চার্ট অনুযায়ী খাবারের পরিমাণ ও মান যাচাই করেই সরবরাহ নেওয়া হয়। তবে নির্ধারিত সংখ্যার চেয়ে রোগী বেশি হলে বাড়তি বরাদ্দের প্রয়োজন হতে পারে।

সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. শহীদুল্লাহ দেওয়ান জানান, সাধারণ ডায়েটে সকালে রুটি, কলা ও সেদ্ধ ডিম, দুপুরে ভাত, ডাল ও মাছ বা মাংস এবং রাতে মাছ বা মাংস ও সবজি দেওয়া হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী হাই-প্রোটিন ডায়েটে দুধ ও ডিম বাড়ানো হয়।

নাটোরের সিংড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মুজাহিদুল ইসলাম জানান, তাঁদের ৫০ শয্যার হাসপাতালে শয্যার ভিত্তিতে ডায়েট বরাদ্দ হয়। সকালে রুটি, কলা ও ডিম, দুপুরে ভাত, মুরগি, ডাল ও সবজি এবং রাতে মুরগি বা মাছ দেওয়া হয়।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও পুষ্টিবিদদের মতে, হাসপাতালের পথ্য শুধু ক্ষুধা মেটানোর বিষয় নয়; রোগীর দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। রোগীর বয়স, রোগের ধরন ও শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে খাবারের ধরন ও পরিমাণ নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এতে পর্যাপ্ত ক্যালরি, প্রোটিন, ভিটামিন, খনিজ ও তরল নিশ্চিত করতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একসময় সরকারি হাসপাতালে রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী একাধিক ধরনের ডায়েটের ব্যবস্থা থাকলেও এখন অনেক ক্ষেত্রে সেই বৈচিত্র্য কমে গেছে। অথচ একজন সাধারণ রোগী, অস্ত্রোপচারের পরের রোগী কিংবা উচ্চ প্রোটিন প্রয়োজন এমন রোগীর খাদ্যচাহিদা এক নয়। তাই রোগভেদে পৃথক খাদ্যতালিকা নিশ্চিত করার পাশাপাশি খাবারের মানও নিয়মিত তদারকির আওতায় আনা দরকার।

জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. আবু জামিল ফয়সালের মতে, রোগীর পথ্যকে চিকিৎসার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখতে হবে। শুধু খাবারের জন্য বরাদ্দ কত টাকা, সেটি দেখলেই হবে না; সেই অর্থে রোগীর পাতে কী দেওয়া হচ্ছে এবং তাতে তাঁর প্রয়োজনীয় পুষ্টি কতটা পূরণ হচ্ছে, সেটিও বিবেচনা করতে হবে।

এদিকে সরকারি হাসপাতালে রোগীদের খাবারের বরাদ্দ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, রোগীপ্রতি তিন বেলার খাবারের বরাদ্দ ২৫০ টাকা করার প্রস্তাব স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ থেকে অর্থ বিভাগে পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, এই অর্থের ওপর কোনো ভ্যাট থাকবে না।

বরাদ্দ বাড়ানোর এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে রোগীদের খাবারের মান ও পরিমাণ উন্নত করার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না—রোগীর পাতে নির্ধারিত পরিমাণ ও পুষ্টিমানসম্পন্ন খাবার পৌঁছাচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে কার্যকর তদারকি ও জবাবদিহিও জরুরি।