ভঙ্গুর অর্থনীতি সামলে সরকারের ১৮০ দিন: সাফল্যের পাশে কঠিন বাস্তবতা

সামাজিক সুরক্ষা ও কূটনীতিতে বেশ কিছু ইতিবাচক উদ্যোগের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংকিং খাত, রাজস্ব ঘাটতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা, আইনশৃঙ্খলা ও বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট এখনো সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।
বদিউল আলম লিংকন: দায়িত্ব নেওয়ার ১৮০ দিন পূর্ণ করেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পর প্রথম দিন থেকেই অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। কিন্তু ছয় মাসের হিসাব বলছে—কিছু ক্ষেত্রে সরকার দ্রুত উদ্যোগ ও দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে পারলেও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখনো অর্থনীতি।
বিশেষ করে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংকিং খাত, কম রাজস্ব আদায়, বিনিয়োগে স্থবিরতা, জ্বালানি ব্যয়ের চাপ এবং সীমিত রাজস্ব সক্ষমতার মধ্যে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড় করানোর কাজটি সরকারের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও জুলাইয়ে বলেছে, বাংলাদেশের সামনে এখনো উল্লেখযোগ্য রাজস্ব, আর্থিক খাত ও মূল্যস্ফীতির চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
প্রথম ১৮০ দিনে যেসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি
সরকারের প্রথম ছয় মাসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক দিকগুলোর একটি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির নতুন কাঠামো। ‘ফ্যামিলি কার্ড’কে পরিবারভিত্তিক ডিজিটাল সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। সরকারি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, এই কার্ডের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে নিয়মিত আর্থিক সহায়তা ও ভর্তুকিযুক্ত পণ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। কর্মসূচিটির জাতীয় পর্যায়ে সম্ভাব্য লক্ষ্য ২ কোটি পরিবার এবং মাসিক নগদ সহায়তার কাঠামো ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
কৃষি খাতেও ‘কৃষক কার্ড’ একটি নতুন উদ্যোগ হিসেবে সামনে এসেছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এর লক্ষ্য কৃষকদের ডিজিটাল পরিচয় ও তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থার আওতায় এনে কৃষি উপকরণ, ভর্তুকি, ঋণ, বীমা, প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য সেবা আরও স্বচ্ছভাবে পৌঁছে দেওয়া। সরকারি উদ্যোগটির প্রাক্-পাইলট পর্যায়ে নির্বাচিত এলাকায় ২২ হাজারের বেশি কৃষকের কাছে সরাসরি আর্থিক সহায়তা পৌঁছানোর তথ্যও সামাজিক সুরক্ষা সহায়তা কর্মসূচির সরকারি প্ল্যাটফর্মে দেওয়া হয়েছে।
সরকার নিজেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডকে নতুন সরকারের সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরেছে। মে মাসে জাতিসংঘের এক বৈঠকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নতুন সরকারের সামাজিক-অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলায় এই দুটি কর্মসূচির কথা উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তারেক রহমান দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানো এবং রাষ্ট্রকে একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে দিন-রাত নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। কঠিন ও ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংকিং খাত, জ্বালানি সংকটসহ নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও তিনি দায়িত্বকে কেবল ক্ষমতার বিষয় হিসেবে না দেখে দেশ ও জনগণের প্রতি অঙ্গীকার হিসেবে গ্রহণ করেছেন। রাষ্ট্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া, সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তাঁর এই নিরলস কর্মপ্রচেষ্টা, দায়িত্ববোধ ও দেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।
কূটনীতিতে প্রথম ছয় মাসে দৃশ্যমান সাফল্য
প্রথম ছয় মাসে সরকারের সবচেয়ে স্পষ্ট আন্তর্জাতিক অর্জনগুলোর একটি হলো জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের নির্বাচিত হওয়া।
২ জুনের নির্বাচনে তিনি ৯৯ ভোট পেয়ে সাইপ্রাসের প্রার্থীকে পরাজিত করেন। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ১৯০টি ব্যালটের মধ্যে খলিলুর রহমান পান ৯৯ ভোট এবং প্রতিদ্বন্দ্বী পান ৯১ ভোট। ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব তিনি ৮ সেপ্টেম্বর থেকে এক বছরের জন্য পালন করবেন।
এটি সরাসরি সরকারের কোনো অর্থনৈতিক অর্জন নয়; তবে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান ও বহুপক্ষীয় কূটনীতিতে গ্রহণযোগ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে এটিকে বিবেচনা করা যায়।
এর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর ছিল মালয়েশিয়া ও চীন। মালয়েশিয়ার সরকারি বিবৃতি অনুযায়ী, ২২ জুনের সফরটি ছিল দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর প্রথম দ্বিপক্ষীয় বিদেশ সফর। সেখানে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জনশক্তি, জ্বালানি, কৃষি, শিক্ষা ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়।
চীন সফরেও অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, বাণিজ্য, অবকাঠামো এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ নিয়ে আলোচনা হয়। সফরের আগে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, ১৫ থেকে ১৭টি দ্বিপক্ষীয় দলিলে সইয়ের প্রস্তুতি ছিল। সফর শেষে ১৭টি সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার তথ্য বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে।
এই সফরের গুরুত্ব মূলত দুটি জায়গায়—একদিকে বিদেশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান আকর্ষণের চেষ্টা, অন্যদিকে চীন ও মালয়েশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও সক্রিয় করা। রয়টার্সও সফরটির অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর বিষয়টি উল্লেখ করেছিল।
অর্থনীতিই সরকারের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা
তবে কূটনীতি ও সামাজিক সুরক্ষার উদ্যোগের বাইরে সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা অর্থনৈতিক সংকট।
সরকার যখন দায়িত্ব নেয়, তখন অর্থনীতি ইতোমধ্যেই দীর্ঘমেয়াদি চাপের মধ্যে ছিল। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের জানুয়ারির মূল্যায়নে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নেমে আসে ৩ দশমিক ৭ শতাংশে, যেখানে আগের অর্থবছরে তা ছিল ৪ দশমিক ২ শতাংশ এবং তার আগের বছর ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে ছিল এবং রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা, ব্যাংকিং খাতের সমস্যা ও বিনিয়োগের স্থবিরতা অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াচ্ছিল।
বিশ্বব্যাংকের এপ্রিলের বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদে অর্থনীতির সমস্যার চিত্র আরও স্পষ্ট। সংস্থাটি বলেছে, ধীর প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংকিং খাত, কম রাজস্ব আহরণ এবং বেসরকারি বিনিয়োগের দুর্বলতা বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় সমস্যা হয়ে আছে। ২০২৫ সালের শেষে খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩০ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছিল বলেও বিশ্বব্যাংক উল্লেখ করেছে।
এ অবস্থায় অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের কাজটি শুধু প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর প্রশ্ন নয়; একই সঙ্গে ব্যাংক বাঁচানো, রাজস্ব বাড়ানো, মূল্যস্ফীতি কমানো, বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং বিনিয়োগ ফিরিয়ে আনার প্রশ্ন।
ব্যাংকিং খাত: সবচেয়ে বড় কাঠামোগত ঝুঁকি
বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বল জায়গাগুলোর একটি ব্যাংকিং খাত। বিশ্বব্যাংকের জুনের হিসাবে, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত দাঁড়ায় ৩২ দশমিক ৬ শতাংশ। একই সঙ্গে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূলধন-ঝুঁকি অনুপাত ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে গিয়েছিল।
এই পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত শক্তিশালী করতে ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন অনুমোদন করেছে। এর আওতায় আমানত সুরক্ষা, ব্যাংক পুনর্গঠন, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দুর্বল ব্যাংক ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো তৈরির উদ্যোগ রয়েছে।
অর্থাৎ সরকারের সামনে শুধু নতুন ঋণ দেওয়া বা ব্যাংকিং কার্যক্রম বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ নেই; বরং পুরোনো খেলাপি ঋণ, দুর্বল মূলধন, সুশাসনের ঘাটতি এবং ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন—সবগুলোকে একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে।
প্রবৃদ্ধির গতি এখনো দুর্বল
এডিবির জুলাই ২০২৬-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে। দুর্বল রপ্তানি, কম বেসরকারি বিনিয়োগ ও সরবরাহগত সীমাবদ্ধতা প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ তৈরি করেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও কমিয়ে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে, যার পেছনে জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা ও ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকিকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও সতর্ক করেছে আইএমএফ। জুলাইয়ের মিশন শেষে সংস্থাটি বলেছে, সংস্কারে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে এবং মধ্যমেয়াদে তা ৩ শতাংশের নিচেও চলে যেতে পারে।
এখানেই সরকারের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের গভীরতা। একদিকে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বিনিয়োগ দরকার, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর আর্থিক নীতি প্রয়োজন। ব্যাংকিং খাতকে পুনর্গঠনে বিপুল অর্থ ও কঠিন সিদ্ধান্ত প্রয়োজন, আবার সরকারি ব্যয় বাড়ানোরও সুযোগ সীমিত।
মূল্যস্ফীতি ও মানুষের জীবনযাত্রার চাপ
সরকারের প্রথম ছয় মাসের অন্যতম বড় অসম্পূর্ণতা দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ। দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও মূল্যস্ফীতির চাপ পুরোপুরি কাটেনি।
বিশ্বব্যাংক এপ্রিলের পূর্বাভাসে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৫ শতাংশের কাছাকাছি থাকার কথা জানিয়েছিল। নিম্ন আয়ের মানুষের মজুরি মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে বলেও সংস্থাটি উল্লেখ করেছে।
আইএমএফও জানুয়ারিতে বলেছিল, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৯ শতাংশ থাকতে পারে। জুলাইয়ের মূল্যায়নে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি ও আমদানি ব্যয় বেড়ে মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ তৈরি হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
অর্থাৎ সরকারের জন্য মূল্যস্ফীতি শুধু বাজার ব্যবস্থাপনার সমস্যা নয়; এটি এখন বৈদেশিক বাজার, জ্বালানি, আমদানি ব্যয়, মুদ্রানীতি ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত একটি বড় সামষ্টিক অর্থনৈতিক সমস্যা।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্বস্তি, তবে ঝুঁকি কাটেনি
অর্থনীতির একটি ইতিবাচক দিক হলো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কিছুটা পুনরুদ্ধার। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার; আন্তর্জাতিক হিসাব পদ্ধতি অনুযায়ী তা ছিল প্রায় ৩২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। এক বছর আগে, ২০২৫ সালের জুনে মোট রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার এবং একই পদ্ধতিতে ২৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার।
এটি সরকারের জন্য একটি ইতিবাচক ভিত্তি। তবে এটিকে অর্থনীতির পূর্ণ পুনরুদ্ধার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ আইএমএফ বলছে, রিজার্ভ পুনর্গঠন অব্যাহত রাখতে মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি ও বিনিময় হার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ধরে রাখতে হবে।
রাজস্ব আদায়: সরকারের জন্য নীরব কিন্তু বড় সংকট
বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে কঠিন সমস্যাগুলোর একটি হলো রাজস্ব আহরণের দুর্বলতা। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক উভয়েই রাজস্ব ব্যবস্থার দুর্বলতাকে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
সরকারকে একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা বাড়াতে হচ্ছে, অবকাঠামো ও জনসেবায় ব্যয় করতে হচ্ছে, জ্বালানি ভর্তুকির চাপ সামলাতে হচ্ছে এবং ব্যাংকিং খাত সংস্কারের মতো ব্যয়বহুল কাজ করতে হচ্ছে। কিন্তু রাজস্ব আদায়ের ভিত্তি দুর্বল হলে এসব ব্যয় পরিচালনার জন্য সরকারের আর্থিক পরিসর সংকুচিত হয়।
আইএমএফ জুলাইয়ে স্পষ্টভাবে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো ও ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণের মাধ্যমে সরকারের আর্থিক পরিসর তৈরির ওপর জোর দিয়েছে। একই সঙ্গে দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন এবং মূল্যস্ফীতি কমাতে কঠোর আর্থিক ও মুদ্রানীতি বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি: অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ
সরকারের প্রথম ছয় মাসে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতিও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এক প্রতিবেদনে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং, অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল এবং গ্যাস সংকটের কথা উঠে এসেছে। একই প্রতিবেদনে সরকার আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও একটি টার্মিনাল নষ্ট হওয়ার কারণে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে বলে ব্যাখ্যা করেছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও জুলাইয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আমদানি ও ভর্তুকি ব্যয় বাড়া এবং নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরির কথা জানিয়েছে।
ফলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট এখন কেবল জনদুর্ভোগ নয়; এটি শিল্প উৎপাদন, পরিবহন ব্যয়, বিনিয়োগ এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
আইনশৃঙ্খলা: সরকারের বড় অপূর্ণতা
প্রথম ১৮০ দিনের মূল্যায়নে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সরকারের জন্য একটি বড় দুর্বল জায়গা হিসেবে সামনে এসেছে।
এক প্রতিবেদনে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ফেব্রুয়ারি-জুলাইয়ের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, এই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতন বা সহিংসতায় ২২০ জন মারা গেছেন, বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা ঘটেছে নয়টি, কারাগারে মারা গেছেন ৫৫ জন এবং ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৩৬৫টি। একই সময়ে মব সহিংসতায় ১২০ জনের মৃত্যুর কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অতএব, সামাজিক সুরক্ষা ও কূটনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন সরকারের জন্য এখনো বড় পরীক্ষার জায়গা।
ভারত সম্পর্ক: কূটনৈতিক সুযোগ, কিন্তু জটিল বাস্তবতা
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সরকারের প্রথম ১৮০ দিনকে এখনো অমীমাংসিত অধ্যায় বলা যায়।
রোববারের (১৬ আগস্ট) রয়টার্স প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত সফরের আগে বাংলাদেশ একটি অনুকূল কূটনৈতিক পরিবেশ চাচ্ছে। দুই দেশের যোগাযোগ অব্যাহত থাকলেও শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান ও সাম্প্রতিক ঘটনাবলির কারণে সম্পর্কের সংবেদনশীলতা রয়ে গেছে।
অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত স্বার্থের কারণে ভারতের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলে পরবর্তী ছয় মাসে সরকারের কূটনৈতিক দক্ষতার অন্যতম বড় পরীক্ষা হবে—চীন ও অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে কার্যকর ভারসাম্য তৈরি করা।
১৮০ দিনের সারসংক্ষেপ: সাফল্য আছে, কিন্তু অর্থনীতি এখনো ভঙ্গুর
তারেক রহমান সরকারের প্রথম ১৮০ দিনকে এক কথায় সাফল্য বা ব্যর্থতা দিয়ে বিচার করা কঠিন। বরং এটি এমন একটি সময়, যখন সরকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের ভিত্তি তৈরি করেছে, কিন্তু কাঠামোগত সমস্যার সমাধানে এখনো দীর্ঘ পথ বাকি।
ইতিবাচক দিকগুলো হলো—
ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে পরিবারভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষার নতুন কাঠামো তৈরি;
কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের ডিজিটাল সেবা কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ;
ব্যাংকিং খাত সংস্কারের জন্য আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা পাওয়া;
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পুনরুদ্ধার;
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে বাংলাদেশের প্রার্থী নির্বাচিত হওয়া;
মালয়েশিয়া ও চীনের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার;
বিদেশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান আকর্ষণের জন্য নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ।
অন্যদিকে সবচেয়ে বড় অসম্পূর্ণতা ও ঝুঁকি রয়ে গেছে মূল্যস্ফীতি, আইনশৃঙ্খলা, বিদ্যুৎ-জ্বালানি, ব্যাংকিং খাত, রাজস্ব আহরণ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে।
সামনে সরকারের আসল পরীক্ষা
প্রথম ১৮০ দিন মূলত সরকারকে পরিস্থিতি বোঝার এবং নীতির ভিত্তি তৈরির সময় দিয়েছে। কিন্তু পরবর্তী ১৮০ দিনে জনগণ উদ্যোগ নয়, ফল দেখতে চাইবে।
অর্থনীতির ক্ষেত্রে সরকারের সামনে মূল কাজ হবে তিনটি—মূল্যস্ফীতি কমানো, ব্যাংকিং খাত পরিষ্কার করা এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ফিরিয়ে আনা।
এর সঙ্গে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, ভর্তুকির চাপ নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল করা এবং সামাজিক সুরক্ষাকে আরও লক্ষ্যভিত্তিক করা জরুরি।
আইএমএফের সর্বশেষ মূল্যায়ন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাটি দিয়েছে: সংস্কার বিলম্বিত হলে প্রবৃদ্ধি আরও কমতে পারে এবং ব্যাংকিং, রাজস্ব ও বৈদেশিক খাতের ঝুঁকি পরস্পরকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
সুতরাং তারেক রহমান সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত সংকটের মধ্যে অর্থনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য কিছু নতুন ভিত্তি তৈরি করা। আর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সেই ভিত্তিকে বাস্তব অর্থনৈতিক ফলাফলে রূপ দেওয়া।
বিগত সরকারের দীর্ঘ শাসন আমলে প্রশাসনের একটি অংশে গড়ে ওঠা বিদেশী-ঘেঁষা মানসিকতা ও পুরোনো প্রশাসনিক প্রভাব বর্তমান সরকারের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে-এমন অভিযোগ ও রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক সংকট, আইনশৃঙ্খলা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক জটিলতা মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অত্যন্ত কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে আবেগের পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থ, রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে তাঁকে বেশ কিছু কঠিন ও সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আগামী দিনগুলোতেই স্পষ্ট হবে, এই বহুমুখী চাপ সামলে তিনি কতটা কার্যকরভাবে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজের নিয়ন্ত্রণে এনে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের পথে এগিয়ে নিতে পারেন।
বাংলাদেশের সামনে এখন প্রশ্ন—সরকার কি ভঙ্গুর অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করে টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে নিতে পারবে? উত্তরটি নির্ভর করবে আগামী ছয় মাসে ব্যাংকিং সংস্কার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং জ্বালানি নিরাপত্তায় সরকার কতটা কঠিন ও কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারে তার ওপর।
১৮০ দিনের অর্জন তাই সরকারের জন্য শেষ হিসাব নয়; বরং এটি কঠিন পুনর্গঠনের প্রথম অধ্যায়।







