উৎপাদন ব্যয়ের চাপে টালমাটাল কৃষি খাত

সার-ডিজেলের দাম বাড়ায় কমছে কৃষকের লাভ, বাড়ছে টিকে থাকার লড়াই
বিশেষ প্রতিনিধি: উৎপাদন ব্যয় ক্রমাগত বেড়ে যাওয়ায় দেশের কৃষি খাত এখন বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। ডিজেল, সার, বীজ, কীটনাশক ও শ্রমিক খরচ বৃদ্ধির কারণে ফসল উৎপাদনে ব্যয় বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়ছে না কৃষিপণ্যের বাজারমূল্য। ফলে ধান, ভুট্টা, আলু কিংবা সবজি-সব ধরনের চাষাবাদেই লাভের বদলে লোকসানের শঙ্কা বাড়ছে কৃষকদের মধ্যে।
কৃষকেরা বলছেন, কৃষি এখন আর আগের মতো লাভজনক পেশা নেই; বরং দিন দিন তা টিকে থাকার সংগ্রামে পরিণত হচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষক আবদুল কাদের বলেন, “ডিজেল ছাড়া জমিতে সেচ দেওয়া যায় না। কিন্তু ডিজেলের দাম এত বেড়েছে যে এবার চাষ করাই কঠিন হয়ে গেছে।”
তিনি জানান, আগে এক বিঘা জমিতে যে খরচে চাষ করা যেত, এখন প্রায় দ্বিগুণ ব্যয় হচ্ছে। সেচের পাশাপাশি সার, বীজ, কীটনাশক ও শ্রমিকের খরচও বেড়েছে কয়েকগুণ। অথচ বাজারে ফসল বিক্রি করে সেই খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে কৃষকদের।
রাজশাহীর কৃষক রমজান আলী বলেন, “আগে মৌসুমের শুরুতেই সহজে সার পাওয়া যেত। এখন দাম শুনলেই ভয় লাগে। অনেক সময় প্রয়োজনের অর্ধেক সার কিনে ফিরে আসতে হয়।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা মাঠে কাজ করি, কিন্তু লাভটা চলে যায় অন্যদের হাতে। উৎপাদনের খরচ, পরিবহন ও বাজার কমিশন মেটাতে গিয়ে কৃষকের হাতে খুব সামান্যই থাকে।”
সারের বাজারে অস্থিরতা, ঋণের বোঝা বাড়ছে
কৃষকেরা জানান, ইউরিয়া, টিএসপি ও পটাশ সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় মৌসুম শুরুর আগেই অনেক কৃষক আর্থিক সংকটে পড়ছেন। অনেকে চাষাবাদ চালিয়ে যেতে ঋণের ওপর নির্ভর করছেন। কেউ কেউ জমির একটি অংশ পতিত রাখতেও বাধ্য হচ্ছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, “ধান বিক্রি করেই এখন ঋণ শোধ হয়ে যায়। নিজের হাতে কিছুই থাকে না।”
কৃষকদের অভিযোগ, ফসল উৎপাদনের সময় বাজারে দাম কম থাকে। আবার বিক্রির মৌসুমে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে ন্যায্যমূল্য থেকেও বঞ্চিত হন তারা। ফলে উৎপাদনের ঝুঁকি পুরোপুরি কৃষকের কাঁধেই থেকে যায়।
কৃষি টিকিয়ে রাখতে ভর্তুকি ও বাজার নিয়ন্ত্রণ জরুরি
অর্থনীতিবিদ ও কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষি খাতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আনতে হলে কার্যকর ভর্তুকি নীতি, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, সেচ সহায়তা এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় শক্ত নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতিতে চাপ তৈরি হয়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি খাতের পাশাপাশি দেশের কৃষি খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।”
তিনি আরও বলেন, “দেশীয় সার কারখানাগুলো দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকে শুধু অর্থনৈতিক খাত হিসেবে নয়, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও জীবন-জীবিকার ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কৃষক টিকলে তবেই দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকবে।






