বিচার ঘিরে ‘ন্যারেটিভ

সেনা কর্মকর্তাদের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রশ্নবিদ্ধ করতে সক্রিয় অপপ্রচারচক্র, অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের

টুইট ডেস্ক: গুম, খুন ও নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত সামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে চলমান বিচারপ্রক্রিয়াকে ঘিরে দেশি-বিদেশি অপপ্রচার এবং বিভ্রান্তিকর প্রচারণার অভিযোগ উঠেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার শুরু হওয়ার পর থেকেই একটি মহল এটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কৌশল নিয়েছে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবী, ভুক্তভোগী ও প্রসিকিউশন সংশ্লিষ্টরা।

তাদের অভিযোগ, ভারতপন্থি কিছু গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রচারক এবং আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী সমন্বিতভাবে বিচারকে ধীরগতি ও বিতর্কিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। একই সঙ্গে সাক্ষীদের বিরুদ্ধে অপতথ্য ছড়িয়ে ভয়ভীতি তৈরিরও অভিযোগ রয়েছে।

ট্রাইব্যুনালে সেনা কর্মকর্তাদের বিচার

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সংঘটিত গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, অপহরণ এবং ডিজিএফআই ও র‍্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে নির্যাতনের অভিযোগে একাধিক সামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে।

গত বছরের ২২ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল-১–এ ১৫ সেনা কর্মকর্তাকে হাজির করা হয়। এর আগে ৮ অক্টোবর তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। মামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে ডিজিএফআইয়ের জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল (জেআইসি) ও র‍্যাবের টিএফআই সংশ্লিষ্ট গুম-নির্যাতনের অভিযোগ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ।

প্রসিকিউশন সূত্র জানিয়েছে, ইতোমধ্যে একাধিক ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শী আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপি নেতা হুম্মাম কাদের চৌধুরী, সাবেক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমান, ব্যারিস্টার আরমানসহ আরও কয়েকজন গুমের শিকার ব্যক্তি।

‘বিচার বিলম্বিত করার কৌশল’

ট্রাইব্যুনালসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, আসামিপক্ষ শুরু থেকেই মামলা জটিল ও দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করছে। অপ্রয়োজনীয় নথিপত্র চাওয়া, এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং বিচারের কাঠামো নিয়ে বিতর্ক তৈরির মাধ্যমে বিচারপ্রক্রিয়া ধীর করার অপচেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বর্তমান চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেছেন, মামলাগুলোতে বহু আসামি থাকায় জেরা ও সাক্ষ্যগ্রহণে সময় লাগছে। তবে বিচারপ্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক বাধা নেই বলে তিনি দাবি করেন। একই সঙ্গে বিচার দ্রুত ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন করতে সবার সহযোগিতাও কামনা করেন।

‘ইন্ডিয়া ফ্যাক্টর’ ও অপপ্রচার

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ভারতের কিছু গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রচারক সামরিক কর্মকর্তাদের “নির্দোষ” হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের একটি ইংরেজি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত কয়েকটি প্রতিবেদনে অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তাদের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

একই সঙ্গে মামলার সাক্ষীদের নিয়েও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। গুমের মামলার সাক্ষী সাবেক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমানকে নিয়ে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে প্রচারণা চালানো হয়েছে বলেও দাবি করা হয়।

এ ছাড়া কিছু ইউটিউব চ্যানেল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মে সাক্ষীদের বক্তব্যকে ‘সাজানো’ আখ্যা দিয়ে বিচারপ্রক্রিয়াকে অবিশ্বাস্য করে তোলার প্রচেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্টরা।

ভুক্তভোগীদের আতঙ্ক ও হতাশা

গুম ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা বলছেন, বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হলেও তারা এখনো নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। অনেকের অভিযোগ, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলো আতঙ্কে রয়েছে।

২০১৯ সালে গুম হওয়া ইসমাইল হোসেন বাতেনের স্ত্রী নাসরিন জাহান স্মৃতি বলেন, অভিযোগ দায়েরের পরও অভিযুক্ত র‍্যাব সদস্যদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা হয়নি। এতে পরিবারগুলো নতুন করে ভয় ও অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

খুলনার শিক্ষার্থী মোস্তাফিজুর রহমান সিফাতের পরিবারও একই ধরনের হতাশা প্রকাশ করেছে। পরিবারের দাবি, গুমের পর দীর্ঘ রিমান্ড শেষে তাকে হত্যা করা হলেও এখনো বিচার দৃশ্যমান হয়নি।

‘গুম সংস্কৃতি বন্ধে সত্য স্বীকার জরুরি’

গুমের শিকার ও মামলার সাক্ষী সাবেক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমান বলেন, বিচার বিলম্বিত করার চেষ্টা থাকলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সত্য প্রতিষ্ঠা করা। তার ভাষায়, “বাংলাদেশে যেন আর কখনো গুম সংস্কৃতি ফিরে না আসে, সেটিই সবচেয়ে জরুরি।”

অন্যদিকে মামলার সাক্ষী মাসরুর আনোয়ার চৌধুরীর দাবি, অভিযুক্তদের দায়মুক্তি দেওয়ার জন্য ‘হুকুমের গোলাম’ তত্ত্ব সামনে আনা হচ্ছে। তার মতে, বিচারকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে সংগঠিতভাবে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

এখন পর্যন্ত মামলার অবস্থা

টিএফআই সংশ্লিষ্ট মামলায় মোট ১৭ জন আসামির মধ্যে ১০ জন বর্তমানে হেফাজতে রয়েছেন। ডিজিএফআই–সংশ্লিষ্ট মামলায় ১৩ জনের মধ্যে তিনজন গ্রেপ্তার হয়েছেন।

মামলাগুলোর প্রধান আসামিদের তালিকায় রয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারেক আহমেদ