লাভের ফাঁদে তামাক চাষ: তারাগঞ্জে বদলে যাচ্ছে ফসলের মানচিত্র

লাভের আশায় খাদ্যশস্য ছেড়ে তামাক চাষে কৃষক, স্বাস্থ্য ও পরিবেশে বাড়ছে ঝুঁকি।|
আব্দুল্লাহিল শাহীন: রংপুর অঞ্চলে তামাক চাষের বিস্তার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় তামাকের আবাদ বৃদ্ধি পেলেও সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে তারাগঞ্জ উপজেলায়।
অধিক মুনাফার আশায় উর্বর কৃষিজমিতে ধান, ভুট্টা, আলু ও গমের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যশস্যের পরিবর্তে তামাক চাষে ঝুঁকছেন কৃষকেরা। এতে একদিকে খাদ্যশস্য উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর নতুন ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
সম্প্রতি তারাগঞ্জ উপজেলার কুর্শা ইউনিয়নের রহিমাপুর এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন শুধু তামাকের ক্ষেত। আগে যেখানে ধান, ভুট্টা, আলু ও গমের চাষ হতো, সেখানে এখন তামাক ছাড়া অন্য ফসল প্রায় নেই।
উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে তারাগঞ্জ উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে প্রায় এক হাজার একশ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়েছে। তবে তামাক ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের হিসাবে এই পরিমাণ এক হাজার ছয়শ হেক্টরেরও বেশি।
ক্ষেতে তামাক গাছের পরিচর্যা, আগাছা পরিষ্কার এবং পাতা সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকেরা। দিনের অধিকাংশ সময়ই তাদের কাটছে তামাকের ক্ষেতে।
চাকলা গ্রামের কৃষক শহিদুল ইসলাম, দিলীপ রায়, ভূপেন চন্দ্র ও রবিউল ইসলাম জানান, গত কয়েক বছরে তারাগঞ্জে তামাক চাষ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বহুজাতিক তামাক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন, সহজ ঋণ এবং আগাম বীজ-সার সরবরাহের কারণে কৃষকেরা এই চাষে উৎসাহিত হচ্ছেন। প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা সরাসরি মাঠপর্যায়ে গিয়ে কৃষকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তামাক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ছাড়াও বিড়ি, সিগারেট ও জর্দা তৈরিকারী সংস্থার প্রতিনিধিরাও কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে বীজ, সার ও কীটনাশক সরবরাহ করেন। মৌসুম শেষে উৎপাদিত তামাকপাতা নির্ধারিত দামে কিনে নেওয়ায় সহজ বাজার ও বেশি লাভের আশায় কৃষকেরা ধীরে ধীরে তামাক চাষে ঝুঁকছেন।
কৃষকদের হিসাবে, এক কেজি তামাক উৎপাদনে খরচ হয় প্রায় ৭০ থেকে ৮০ টাকা, আর বিক্রি হয় ১৭০ থেকে ২১০ টাকায়। অন্যদিকে আলু উৎপাদনে প্রতি কেজিতে খরচ ১৪ থেকে ১৬ টাকা হলেও বর্তমান বাজারে আলুর দাম ১০ টাকার নিচে। গত বছর আলুর ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় অনেক কৃষক সংরক্ষিত আলু নষ্ট করে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন। লোকসান এড়াতেই অনেকেই তামাক চাষে ঝুঁকছেন।
তারাগঞ্জের ইকরচালী ইউনিয়নের তামাকচাষি লাল মিয়া বলেন, “তামাক চাষে লাভ নিশ্চিত। প্রতিষ্ঠানের লোকজন বীজ বপন থেকে শুরু করে বিক্রি পর্যন্ত সবসময় মাঠে থাকে। প্রতি কেজি ১৮০ থেকে ২১০ টাকায় কিনে নেয়। তাই অনেক কৃষক এখন তামাক চাষে আগ্রহী।”
রংপুর সদরের পাগলাপীর শলেশাহ এলাকার কৃষক ফিরোজ ইসলাম জানান, গত বছর দুই একর জমির আলু হিমাগারে রাখতে গিয়ে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। কিন্তু এক একর জমিতে তামাক চাষ করে প্রায় দেড় লাখ টাকা লাভ হয়েছে। ফলে এবার তিনি তামাকের আবাদ বাড়িয়েছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, উত্তরাঞ্চলের রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারী জেলায় তামাক চাষ হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আবাদ রংপুর ও লালমনিরহাট জেলায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রংপুর অঞ্চলে প্রায় ২১ হাজার ২৯৫ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়েছে, যেখানে গত বছর ছিল ১৮ হাজার ৭৩৩ হেক্টর। অর্থাৎ এক বছরে প্রায় দুই হাজার পাঁচশত হেক্টরের বেশি জমিতে তামাক চাষ বেড়েছে।
অন্যদিকে একই সময়ে আলু চাষ কমেছে উদ্বেগজনক হারে। চলতি বছর রংপুর অঞ্চলে আলু চাষ হয়েছে এক লাখ পাঁচ হাজার ৮৮৫ হেক্টর জমিতে, যেখানে গত বছর ছিল এক লাখ ১৯ হাজার ৭৩৯ হেক্টর। অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ১৪ হাজার হেক্টর জমিতে আলু চাষ কমেছে।
তামাকবিরোধী গণমাধ্যম জোটের সদস্য খোরশেদ আলম বলেন, রংপুর অঞ্চলে শিল্পকারখানা কম থাকলেও দেশি-বিদেশি তামাক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছে। এটিই তামাক চাষ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, তামাক চাষ পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
রংপুরের সিভিল সার্জন শাহীন সুলতানা বলেন, তামাক মানুষের শরীরের প্রায় সব অঙ্গের জন্য ক্ষতিকর। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ফুসফুস ও হৃদযন্ত্র। তাই তামাকচাষিদের বিকল্প ফসল চাষে উৎসাহিত করা জরুরি।
তারাগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ধীবা রানী রায় বলেন, “তামাক কোনো ভালো ফসল নয়। এটি পরিবেশ ও মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। তামাক চাষের ফলে জমির উর্বরতাও কমে যায়। কৃষকদের তামাক থেকে নিরুৎসাহিত করতে আমরা সচেতনতা কার্যক্রম চালাচ্ছি এবং বিকল্প লাভজনক ফসল চাষে উৎসাহ দিচ্ছি।”
বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্পমেয়াদি লাভের কারণে তামাক চাষ বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে এটি খাদ্যনিরাপত্তা, পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তাই কৃষকদের বিকল্প লাভজনক খাদ্যশস্যে ফিরিয়ে আনতে কার্যকর নীতিমালা ও সহায়তা প্রয়োজন।






