হালদার প্রজননক্ষেত্র অস্তিত্ব সংকটে

৫৭টি দূষণের উৎস শনাক্ত, ঝুঁকিতে ২৩ উদ্ভিদ প্রজাতি; অবৈধ বালু উত্তোলন ও লবণাক্ততায় বাড়ছে পরিবেশগত সংকট।
টুইট প্রতিবেদক: দূষণ, লবণাক্ততা, অবৈধ বালু উত্তোলন ও অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের চাপে ক্রমেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে চট্টগ্রামের হালদা নদী। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত নদীটির পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য এখন গুরুতর হুমকির মুখে। বিশেষ করে রুইজাতীয় মাছের প্রজনন, জলজ প্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল এবং দেশীয় উদ্ভিদ প্রজাতির অস্তিত্ব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় হালদা নদীর উৎস থেকে মোহনা পর্যন্ত ৮১ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ৫৭টি দূষণের উৎস শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৯টি উৎস সরাসরি নদীর পানিদূষণের জন্য দায়ী। এসব উৎসের ১৩টিকে অত্যন্ত বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন গবেষকেরা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. শেখ বখতিয়ার উদ্দীনের তত্ত্বাবধানে এবং অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুকের নেতৃত্বে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। এতে নদী ও দুই তীরের উদ্ভিদ বৈচিত্র্য, দূষণের উৎস এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের চিত্র উঠে এসেছে।
গবেষণায় হালদা নদী ও এর দুই তীরের ৮১ কিলোমিটার এলাকায় মোট ১ হাজার ২৯টি উদ্ভিদ প্রজাতি শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭২৯টি প্রজাতি প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত হয়েছে। শনাক্ত উদ্ভিদের মধ্যে ৭৬৫টি দেশীয় এবং ২৪৪টি বিদেশি প্রজাতি। গবেষকদের মতে, বিদেশি উদ্ভিদের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার স্থানীয় উদ্ভিদের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে এবং বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট করছে।
উদ্ভিদ বৈচিত্র্যের পাশাপাশি বিপন্ন প্রজাতির সংখ্যাও উদ্বেগজনক। গবেষণায় শনাক্ত উদ্ভিদের মধ্যে ৫১৭টি ঔষধি গুণসম্পন্ন। অন্যদিকে, ২৩টি উদ্ভিদ প্রজাতিকে মারাত্মক বিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে বাটনা, লেইস্যা গর্জন, চাউ তাল, ঈশ্বরমূল ও পাখা ঢেকিয়া। দ্রুত সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিলে এসব দেশীয় উদ্ভিদ হালদা অববাহিকা থেকে হারিয়ে যেতে পারে।
গবেষণায় হালদার উজানে কেওড়াগাছের উপস্থিতিকেও বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সাধারণত লবণাক্ত পরিবেশে জন্মানো এই উদ্ভিদের বিস্তার নদীর উজানে লবণাক্ততার প্রভাব বাড়ার সম্ভাব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেলে রুই, কাতলা, মৃগেল ও কালবাউশসহ কার্পজাতীয় মাছের প্রজনন পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে মা মাছের ডিম ছাড়ার উপযোগী পরিবেশ, ডিমের বিকাশ এবং পোনা বেড়ে ওঠার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গবেষণায় দূষণের প্রধান উৎস হিসেবে শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য, হাটবাজারের আবর্জনা এবং পৌর এলাকার নালা-নর্দমার বর্জ্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অপরিশোধিত এসব বর্জ্য সরাসরি নদীতে মিশে পানির গুণগত মান নষ্ট করছে। পাশাপাশি অববাহিকার ১১টি স্থানে মারাত্মক মাটিদূষণ এবং ১০টি স্থানে বায়ুদূষণের উৎস শনাক্ত হয়েছে। অর্থাৎ সংকটটি শুধু নদীর পানিতে সীমাবদ্ধ নয়, দুই তীরের সামগ্রিক পরিবেশও দূষণের শিকার।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নদীর বিভিন্ন বাঁকে অবৈধভাবে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন। এতে নদীর তলদেশের স্বাভাবিক গঠন ও পানির প্রবাহ পরিবর্তিত হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মাছের আবাসস্থল ও প্রজননের উপযোগী পরিবেশ।
অপরিকল্পিত বাঁধ, রাবার ড্যাম ও স্লুইসগেট নির্মাণের কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে প্রজনন মৌসুমে মা মাছের চলাচল এবং নদীর বিভিন্ন অংশের মধ্যে স্বাভাবিক সংযোগ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দ্রুতগতির ইঞ্জিনচালিত নৌযান চলাচলও হালদার জীববৈচিত্র্যের জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করছে। এসব নৌযানের আঘাতে বিপন্ন গাঙ্গেয় ডলফিন ও প্রজননক্ষম মা মাছ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অসময়ে অতিবৃষ্টি, খরা ও আবহাওয়ার অস্বাভাবিক পরিবর্তন মাছের ডিম ছাড়ার সময় এবং প্রজননচক্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
গবেষক অধ্যাপক ড. শেখ বখতিয়ার উদ্দীন বলেন, হালদা নদীর সরাসরি দূষণের জন্য চিহ্নিত ২৯টি উৎসের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষ করে শিল্পকারখানায় বর্জ্য শোধনাগার ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় দীর্ঘমেয়াদে নদীটি মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে।
তিনি আরও বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলন হালদার জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডগুলোর একটি। এর ফলে মাছের আবাসস্থল নষ্ট হচ্ছে। মা মাছের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে প্রজনন মৌসুমে যান্ত্রিক নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণ কিংবা নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নিতে হবে।
গবেষণার সুপারিশ বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি হালদার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
বিশেষজ্ঞদের গবেষণায় উঠে আসা তথ্য বলছে, হালদা রক্ষায় বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। দূষণের উৎস বন্ধ, শিল্পবর্জ্য শোধন বাধ্যতামূলক করা, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ, লবণাক্ততা পর্যবেক্ষণ এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কারণ, হালদার অস্তিত্ব রক্ষার সঙ্গে দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের বিষয়টি সরাসরি জড়িত।






