বিতর্কের মধ্যেই স্বাধীনতা পুরস্কার নিলেন রেজা পাহলভি

ইরানের জনগণের নামে দেওয়া পুরস্কার গ্রহণ, বৈধ প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃতি নিয়ে প্রশ্ন; জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে সমর্থন ও প্রতিবাদ।

টুইট প্রতিবেদক: জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে ব্যাপক সমর্থন ও সমালোচনার মধ্য দিয়ে ইরানের ক্ষমতাচ্যুত শেষ শাহের ছেলে রেজা পাহলভি ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ গ্রহণ করেছেন। শনিবার (৭ নভেম্বর) ঐতিহাসিক সেন্ট পলস গির্জায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে ইরানের জনগণের পক্ষে তিনি এই পুরস্কার গ্রহণ করেন। তবে তাকে ইরানি জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন আপত্তি জানিয়েছে।

জার্মানির উদারপন্থী দল ফ্রি ডেমোক্রেটিক পার্টির (এফডিপি) ঘনিষ্ঠ ফ্রিডরিখ নাউমান ফাউন্ডেশন এ পুরস্কারের আয়োজন করে। আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের জনগণের গণতন্ত্র, নাগরিক অধিকার ও স্বাধীনতার সংগ্রামের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।

জার্মানির প্রথম নির্বাচিত জাতীয় সংসদের ঐতিহাসিক অধিবেশনস্থল সেন্ট পলস গির্জায় বক্তব্য দিতে গিয়ে রেজা পাহলভি বলেন, ইরান এমন কোনো দেশ নয়, যাকে নতুন করে গণতন্ত্র শেখাতে হবে। বরং দেশটির জনগণকে জোর করে গণতন্ত্র চর্চা থেকে দূরে রাখা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, যে দেশের মানুষ ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত, তারা সেই অধিকার প্রয়োগ করতেও সম্পূর্ণ সক্ষম।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ইরানে সাম্প্রতিক বিক্ষোভে নিহত ব্যক্তিদের কয়েকজন স্বজন। তাদের প্রসঙ্গ তুলে বক্তব্য দেওয়ার সময় একপর্যায়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন পাহলভি।

সমর্থনের পাশাপাশি প্রতিবাদ

ফ্রাঙ্কফুর্টে পাহলভির সমর্থনে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হন। তাদের অনেকের হাতে ছিল ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের আগের ইরানের রাজকীয় পতাকা। তবে এই পুরস্কার গ্রহণের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে শহরটিতে পাল্টা প্রতিবাদও হয়েছে।

জার্মানির মধ্য-বামপন্থী সামাজিক গণতান্ত্রিক দল (এসপিডি) ও গ্রিনস পার্টির ফ্রাঙ্কফুর্ট শাখা অনুষ্ঠানটি বর্জন করে। দল দুটির বক্তব্য, রেজা পাহলভিকে ইরানের জনগণের বৈধ প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

বামপন্থী দল ডি লিঙ্কের ফ্রাঙ্কফুর্ট শাখাও ঐতিহাসিক গির্জায় রাজনৈতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের বিরোধিতা করে। তাদের দাবি, শহরের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী উপাসনালয়টিতে রাজনৈতিক কর্মসূচি আয়োজন করা উচিত নয়।

হেসে অঙ্গরাজ্যের সোসাইটি ফর জার্মান-ইরানিয়ান্সের মুখপাত্র সাহার সানাই জানান, ইরানের কারাগারে বন্দি প্রায় ২০০ ব্যক্তি পাহলভির পুরস্কার গ্রহণের প্রতিবাদ জানিয়ে একটি চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন। তাদের মতে, তিনি অতীতের স্বৈরশাসনের প্রতীক।

বাবার শাসন ও ইসরায়েল-সমর্থন নিয়ে প্রশ্ন

রেজা পাহলভির পুরস্কার গ্রহণ নিয়ে বিতর্কের পেছনে রয়েছে তার পারিবারিক রাজনৈতিক ইতিহাসও। তার বাবা মোহাম্মদ রেজা পাহলভি ছিলেন ইরানের শেষ শাহ। ১৯৭৯ সালের গণবিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে তিনি দীর্ঘদিন কর্তৃত্ববাদী শাসন পরিচালনা করেন। পরে দেশ ছেড়ে নির্বাসনে চলে যান এবং ইরানে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।

সমালোচকদের অভিযোগ, রেজা পাহলভি এখনো তার বাবার শাসনামলের কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে যথেষ্ট স্পষ্টভাবে আলাদা করতে পারেননি। পাশাপাশি ইসরায়েলের প্রতি তার প্রকাশ্য সমর্থনও বিরোধিতার অন্যতম কারণ।

পুরস্কার তেহরানে ফিরিয়ে দেওয়ার ঘোষণা

অনুষ্ঠানে রেজা পাহলভি বলেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে এই পুরস্কার গ্রহণ করছেন না। ইরানে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি কেবল এর অস্থায়ী তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

তার ভাষায়, একদিন বিদেশের মাটিতে নয়, ইরানের রাজধানী তেহরানে গিয়ে তিনি পুরস্কারটি প্রকৃত মালিক অর্থাৎ দেশটির জনগণের হাতে তুলে দিতে চান।

উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের শেষ দিকে ইরানে বড় ধরনের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে নিরাপত্তা বাহিনীর দমন অভিযানে তা স্তিমিত হয়ে পড়ে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার দাবি, ওই অভিযানে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত হয়েছেন।

সব মিলিয়ে, ইরানের জনগণের নামে দেওয়া স্বাধীনতা পুরস্কার রেজা পাহলভির হাতে তুলে দেওয়ার ঘটনাটি দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, রাজতন্ত্রের উত্তরাধিকার এবং বিরোধী শক্তিগুলোর প্রতিনিধিত্ব নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

সূত্র: এএফপি, ডয়চে ভেলে ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।