পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েতে ডিউটি পাসের নামে কোটি টাকার হিসাব, তদন্তের দাবি

ডিজি-সচিবকে অন্ধকারে রেখে চিঠি, চার স্টেশনে ৪ হাজার ৭১৬ বার পাস ইস্যু; নথিভুক্ত অর্থ ১ কোটি ৩ লাখ ৮৯ হাজার টাকা।

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী: বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলে ডিউটি কার্ড পাস ব্যবহারের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বিপুলসংখ্যক পাস ইস্যু এবং সংশ্লিষ্ট অর্থের হিসাব নিয়ে রেলওয়ের অভ্যন্তরে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

সহজের (Shohoz) সার্ভারে সংরক্ষিত রেজিস্ট্রেশন তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত পশ্চিমাঞ্চলের চারটি স্টেশনের সংশ্লিষ্ট চারটি কার্ড ব্যবহার করে মোট ৪ হাজার ৭১৬ বার ডিউটি পাস ইস্যু করা হয়েছে। এসব পাসের বিপরীতে সার্ভারে নথিভুক্ত অর্থের পরিমাণ ১ কোটি ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৯৯ টাকা।

অস্বাভাবিক ডিউটি কার্ড পাস ব্যবহারের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে গত ১৩ জুলাই পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপকের (সিসিএম) পক্ষে উপপ্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা (এফএঅ্যান্ডসিএও, পশ্চিম) বরাবর একটি চিঠি দেন। তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। চিঠির অনুলিপি অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) পর্যন্ত পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

চারটি স্টেশনের ডিউটি কার্ড পাস ব্যবহারের সার্ভার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দিনাজপুর স্টেশনের সিপি ০৩৪১৬৭ নম্বর কার্ড ব্যবহার করে ১ হাজার ৯৫০ বার পাস ইস্যু করা হয়েছে। এর বিপরীতে নথিভুক্ত অর্থের পরিমাণ ৪৪ লাখ ৮০ হাজার ৩০০ টাকা।

রাজশাহী স্টেশনের সিপি ০৩৪১৬৮ নম্বর কার্ডে ১ হাজার ৫০০ বার পাস ইস্যুতে নথিভুক্ত হয়েছে ৩৫ লাখ ৭ হাজার ৮১৩ টাকা।

ঈশ্বরদী স্টেশনের সিপি ০৩৪১৬৯ নম্বর কার্ডে ৯৬৫ বার পাস ইস্যুর বিপরীতে নথিভুক্ত অর্থ ১৯ লাখ ৩৬ হাজার ১৪৪ টাকা।

অন্যদিকে, পার্বতীপুর স্টেশনের সিপি ০৩৪১৬১ নম্বর কার্ডে ৩০১ বার পাস ইস্যুতে নথিভুক্ত হয়েছে ৪ লাখ ১৪ হাজার ৮৪২ টাকা।

সব মিলিয়ে চারটি কার্ডের মাধ্যমে ৪ হাজার ৭১৬ বার পাস ইস্যু হয়েছে এবং সার্ভারে নথিভুক্ত অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৯৯ টাকা।

সার্ভারের তথ্যে দিনাজপুরের কার্ডটি টি আই/এ দিনাজপুর, রাজশাহীর কার্ডটি টি আই/এ রাজশাহী এবং পার্বতীপুরের কার্ডটি টি আই/এ পার্বতীপুরের নামে নিবন্ধিত। অন্যদিকে, ঈশ্বরদীর সিপি ০৩৪১৬৯ নম্বর কার্ডটি টি আই/এ জিএম আবুল কালাম আজাদের নামে নিবন্ধিত বলে উল্লেখ রয়েছে।

তবে এসব কার্ডের বিপরীতে নথিভুক্ত অর্থ কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, প্রতিটি পাস কোন উদ্দেশ্যে ইস্যু করা হয়েছে, কারা এসব পাসের সুবিধাভোগী এবং সংশ্লিষ্ট পাসগুলো প্রচলিত বিধিবিধান অনুসারে ব্যবহৃত হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে সার্ভারের মূল রেকর্ড, পাস ইস্যুর অনুমোদনপত্র এবং সংশ্লিষ্ট হিসাবপত্র নিরীক্ষা করা প্রয়োজন।

অস্বাভাবিক ব্যবহার নিয়ে চিঠি, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছিল কি

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অস্বাভাবিক ডিউটি কার্ড পাস ব্যবহারের বিষয়টি সামনে আসার পর গত ১৩ জুলাই উপপ্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন স্বাক্ষরিত চিঠিটি এফএঅ্যান্ডসিএও (পশ্চিম) বরাবর পাঠানো হয়। চিঠিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়। এর অনুলিপি অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) পর্যন্ত পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে এত বিপুলসংখ্যক পাস ইস্যু এবং কোটি টাকার বেশি অর্থের হিসাব সামনে আসার পর বিষয়টি বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। প্রশাসনিকভাবে বিষয়টি কতটা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে এবং চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

বুকিং সহকারীদের বিরুদ্ধে টিকিট কালোবাজারি সিন্ডিকেটের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ

এদিকে, রাজশাহী রেলস্টেশনের দুই বুকিং সহকারীর বিরুদ্ধে কথিত টিকিট কালোবাজারি সিন্ডিকেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পাওয়া গেছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, ওই দুই বুকিং সহকারীর মাধ্যমে একটি চক্র রেলের টিকিট সংগ্রহ করে থাকে। তাঁদের একজনের স্ত্রী বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপকের (সিসিএম) দপ্তরে কর্মরত বলেও সূত্রটি দাবি করেছে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বুকিং সহকারীদের বক্তব্য এবং অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে তাঁদের দায়িত্ব, টিকিট ইস্যুর রেকর্ড, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সম্ভাব্য আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখা জরুরি।

মহাব্যবস্থাপকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি

বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের বর্তমান মহাব্যবস্থাপক আহম্মেদ হোসেন মাসুম ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে তিনি পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলীসহ রেলওয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।

ডিউটি কার্ড পাস ব্যবহারের অনিয়মের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক চিঠি এবং এ বিষয়ে গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে তাঁর সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগ করা হয়। পাশাপাশি খুদে বার্তাও পাঠানো হয়েছে। কিন্তু প্রতিবেদন প্রস্তুত করা পর্যন্ত তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।

ই-টিকিটিং ব্যবস্থাপনা ও অতীতের অনিয়মের অভিযোগ

বাংলাদেশ রেলওয়ের ই-টিকিটিং ব্যবস্থা পরিচালনা করছে সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেভি (Shohoz-Synesis-Vincen JV)। এ প্রতিবেদনে সহজের সার্ভারে সংরক্ষিত রেজিস্ট্রেশন তথ্যের ভিত্তিতে পাস ইস্যুর সংখ্যা ও নথিভুক্ত অর্থের হিসাব তুলে ধরা হয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রেলওয়ের অনলাইন টিকিটিং ব্যবস্থায় টিকিট কালোবাজারি, বট ব্যবহার এবং সিস্টেম-সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। এ ছাড়া পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের কেনাকাটাসহ অন্যান্য খাতেও অতীতে দুর্নীতির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান ও মামলার নজির রয়েছে।
এ অবস্থায় ডিউটি কার্ড পাস ব্যবহারের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি

চারটি স্টেশনের চারটি কার্ডের মাধ্যমে এক বছরে ৪ হাজার ৭১৬ বার ডিউটি পাস ইস্যু এবং এর বিপরীতে ১ কোটি ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৯৯ টাকা নথিভুক্ত হওয়ার বিষয়টি নিছক পরিসংখ্যান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এসব পাসের প্রকৃত ব্যবহার, অনুমোদন, সুবিধাভোগী এবং অর্থের হিসাব যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। এ জন্য সহজের সার্ভারের মূল রেকর্ড, সংশ্লিষ্ট কার্ডের নিবন্ধন তথ্য, প্রতিটি পাস ইস্যুর অনুমোদনপত্র, যাত্রী বা সুবিধাভোগীদের পরিচয়, হিসাব শাখার নথি এবং ১৩ জুলাই পাঠানো চিঠির পরবর্তী প্রশাসনিক কার্যক্রম পর্যালোচনা করা জরুরি।

একই সঙ্গে রাজশাহী রেলস্টেশনের বুকিং সহকারীদের বিরুদ্ধে ওঠা টিকিট কালোবাজারি সিন্ডিকেটের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও পৃথকভাবে তদন্তের দাবি রাখে।

রেলওয়ের রাজস্ব সুরক্ষা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষায় রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের দাবি উঠেছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তদন্তের ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ব্যাপারে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।