উদয়ন স্কুলের তদন্ত কমিটি থেকে দুই সদস্যের পদত্যাগ

যৌন হয়রানির অভিযোগে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, প্রতিবাদকারীদের শাস্তি দেওয়ার অভিযোগ; তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে আপত্তির মুখে পদত্যাগ দুই সহকারী প্রক্টরের।

টুইট প্রতিবেদক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অধিভুক্ত উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যৌন হয়রানির অভিযোগ তদন্তে গঠিত কমিটি থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই সহকারী প্রক্টর পদত্যাগ করেছেন। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের আপত্তির মুখে তারা কমিটি ছেড়ে দেন। পরে তাদের পরিবর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য দুজনকে তদন্ত কমিটিতে যুক্ত করা হয়েছে।

বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে সহপাঠী ছাত্রীদের যৌন হয়রানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে অশ্লীল ছবি ও ভিডিও তৈরি এবং কুপ্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবিতে আন্দোলনে নামা শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে পাল্টা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে।

বিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আরিফ রহমান গত ৪ নভেম্বর জানান, তদন্ত কমিটিতে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর একেএম নুর আলম সিদ্দিকী ও এনামুল হক সজীব পদত্যাগ করেছেন। তাদের পরিবর্তে নতুন দুজনকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এর আগে গত ৩ নভেম্বর সকাল থেকে যৌন হয়রানির প্রতিবাদে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় ‘মেয়েদের নিরাপত্তা চাই, হয়রানিমুক্ত স্কুল চাই’সহ বিভিন্ন স্লোগানসংবলিত প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন তারা।

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ১০ জন শিক্ষার্থীর শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি স্থগিত করে। পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, প্রক্টর কার্যালয় ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাদের ওপর বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করা হয়।

শিক্ষার্থীদের দাবি, অভিযুক্ত শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. মো. মোফাজ্জল হোসেনের ছেলে হওয়ায় ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। প্রথমে ১০ শিক্ষার্থীকে শ্রেণিকক্ষ ও পরীক্ষা থেকে বিরত রাখা হলেও অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের মুখে তাদের আলাদা কক্ষে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। তবে শ্রেণিকক্ষে অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়নি।

আন্দোলন অব্যাহত রাখলে বিদ্যালয় থেকে ছাড়পত্র দেওয়ার হুমকি এবং তদন্তের নামে অভিযুক্তকে অপহরণ ও মারধরের অভিযোগসংবলিত কাগজে জোর করে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগও করেছেন শিক্ষার্থীরা। এমনকি এক ভুক্তভোগীর পরিবারকে অভিযুক্তের পরিবারের সদস্যরা বাসায় গিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়েছেন বলেও দাবি তাদের।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ছাত্রী জানান, দীর্ঘদিন ধরে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর আচরণে তারা আতঙ্ক ও অস্বস্তিতে ছিলেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে অশ্লীল ছবি ও ভিডিও তৈরি করে তাদের ভয় দেখানো ও হয়রানি করা হয়েছে। বিদ্যালয়ে অভিযোগ জানিয়েও বিচার না পেয়ে উল্টো শাস্তির মুখে পড়তে হয়েছে।

অন্য এক ছাত্রী বলেন, বিদ্যালয়ে মেয়েদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং হয়রানি থেকে রক্ষা পাওয়ার দাবিতেই তারা প্রতিবাদ করেছেন। অভিযুক্তের পারিবারিক পরিচয় বিবেচনায় না নিয়ে অভিযোগের ভিত্তিতে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

তবে অভিযোগের বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বাবা অধ্যাপক মো. মোফাজ্জল হোসেন। তাঁর দাবি, গত ৭ অক্টোবর কয়েকজন শিক্ষার্থী তাঁর ছেলেকে শ্রেণিকক্ষ থেকে বের করে পলাশী মার্কেটের ছাদে এবং পরে আজিমপুরে দুটি ভবনের মাঝখানে নিয়ে মারধর করেন।

তিনি জানান, পরদিন বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন। পরে তাঁর ছেলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগসংবলিত ছবিসহ প্রচারপত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় গত ৩০ অক্টোবর শাহবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও করেছেন তিনি।

অধ্যাপক মোফাজ্জল হোসেনের দাবি, তাঁর ছেলের সঙ্গে অভিযোগকারী কয়েকজন শিক্ষার্থীর আগে বন্ধুত্ব ছিল। পরে একটি ভুয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচয় ব্যবহার করে তাকে ভয়ভীতি দেখানো ও টাকা নেওয়ার ঘটনা ঘটে। টাকা দেওয়া বন্ধ করে সম্পর্ক ছিন্ন করার পরই তাঁর ছেলেকে মারধর করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন অভিযোগ ছড়ানো হয়।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মো. ইসরাফিল প্রাং বলেন, ঘটনাটি তদন্তের দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর কার্যালয়ের নয়, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের। তবে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি এড়াতে সেদিন প্রক্টরিয়াল দলের সদস্যদের পাঠানো হয়েছিল। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।

অন্যদিকে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আরিফ রহমান বলেন, এ ধরনের ঘটনা ঘটলে প্রথমে বিদ্যালয়ের প্রধান হিসেবে তাঁকে জানানো উচিত ছিল। শিক্ষার্থীরা চাইলে শ্রেণিশিক্ষক কিংবা নারী শিক্ষকের কাছেও অভিযোগ জানাতে পারত।

তদন্তে অভিযুক্তের বাবার বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট পরিচয়ের কোনো প্রভাব নেই দাবি করে তিনি বলেন, তদন্ত কমিটির ওপর বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কোনো চাপ সৃষ্টি করেনি। তাঁর দায়িত্ব পালনকালে শিক্ষার্থীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে এবং কারও প্রতি অবিচার করা হবে না।

ঘটনাটি ঘিরে এখন প্রধান প্রশ্ন হয়ে উঠেছে, যৌন হয়রানির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা এবং প্রতিবাদকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ওঠা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার অভিযোগের সুষ্ঠু নিষ্পত্তি কীভাবে নিশ্চিত হবে।