থাই অভিনেত্রীর সম্পদ জব্দের উদ্যোগ, দাতাদের অর্থ ফেরতের প্রক্রিয়া শুরু

দাতাদের অর্থ ফেরত দিতে সম্পদ বিক্রির অর্থ বণ্টনের উদ্যোগ; পুলিশের জব্দ করা সম্পদের তালিকা পাওয়ার অপেক্ষায় অর্থ পাচারবিরোধী সংস্থা।

নিজস্ব প্রতিবেদক: জনসাধারণের সঙ্গে প্রতারণার মামলায় থাইল্যান্ডের অভিনেত্রী ও সমাজকর্মী বুম পানান্দা, গট আথিপ এবং ‘অর্গানাইজেশন ডু গুড’ ফাউন্ডেশনের সংশ্লিষ্ট সম্পদ জব্দ করে ক্ষতিগ্রস্ত দাতাদের মধ্যে অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করেছে দেশটির অর্থ পাচার প্রতিরোধ ও দমন কার্যালয় (এএমএল অফিস)।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর ২০২৬) এএমএল অফিসের আর্থিক তদন্ত বিভাগের বিশেষজ্ঞ এবং সংস্থাটির উপমুখপাত্র উইথায়াফন চান্থাওয়াত জানান, এ ঘটনায় অর্থনৈতিক অপরাধ দমন বিভাগের পুলিশ ইতোমধ্যে কিছু সম্পদ সাময়িকভাবে জব্দ করেছে। পরবর্তী সময়ে পুলিশ জব্দ করা সম্পদের তালিকা ও মামলার নথি এএমএল অফিসে পাঠাবে। এরপর অর্থ পাচারবিরোধী আইনের আওতায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি জানান, বর্তমানে পুলিশের তদন্তকারীরা জব্দ করা সম্পদ নিয়ে প্রয়োজনীয় প্রতিবেদন তৈরির কাজ করছেন। এ পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জব্দ করা সম্পদ ফেরত দেওয়া হবে কি না, কিংবা কোনো সম্পদ মামলার আলামত হিসেবে সংরক্ষণ করা হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা পুলিশের রয়েছে। পুলিশের এই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর সম্পদের তালিকা এএমএল অফিসে পাঠানো হবে।

১৮ লাখের বেশি আর্থিক লেনদেন যাচাই

মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবগুলোতে অর্থ গ্রহণ ও পাঠানোর মোট লেনদেনের সংখ্যা ১৮ লাখের বেশি বলে জানা গেছে। এসব লেনদেনের বিস্তারিত যাচাই করবে তদন্তকারী পুলিশ। এ জন্য ব্যাংকের হিসাব বিবরণী সংগ্রহ করে অর্থের প্রবাহ ও লেনদেনের তথ্য তুলনামূলকভাবে পরীক্ষা করা হবে।

তবে এএমএল অফিসের তদন্তের ধরন কিছুটা ভিন্ন। সংস্থাটি মূলত সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের প্রতিবেদন যাচাই করে থাকে। ফলে পুলিশের বিস্তারিত লেনদেন তদন্ত এবং এএমএল অফিসের সন্দেহজনক লেনদেন পর্যালোচনা দুটি পৃথক প্রক্রিয়া। পুলিশের তদন্তে শনাক্ত হওয়া বিভিন্ন লেনদেনের তথ্য পৃথক ঘটনা ও অভিযোগের ভিত্তিতে মামলার কার্যক্রমে বিবেচনা করা হবে।

প্রতারণা, অর্থ পাচার ও সাইবার অপরাধের অভিযোগ

এএমএল অফিসের উপমুখপাত্র জানান, তদন্তকারীরা এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে জনসাধারণের সঙ্গে প্রতারণা, অর্থ পাচার এবং ২০০৭ সালের কম্পিউটার অপরাধসংক্রান্ত আইনের আওতায় অপরাধের উপাদান পেয়েছেন। পরবর্তী তদন্তে অন্য কোনো আইনের অধীনে অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে নতুন অভিযোগ আনার সুযোগ রয়েছে।

মামলায় আত্মসাতের অভিযোগ কেন যুক্ত করা হয়নি—এমন প্রশ্নেরও ব্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া সীমান্ত পরিস্থিতির সময় সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে অনুদান পাঠানোর আহ্বান জানানো হয়ে থাকলে, সেটি জনসাধারণের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগের আওতায় পড়তে পারে।

অন্যদিকে, কেউ যদি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে ফাউন্ডেশনকে অর্থ প্রদান করেন এবং সেই অর্থ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি ফাউন্ডেশনের নির্ধারিত উদ্দেশ্যের বাইরে অন্য কাজে ব্যবহার করেন, তাহলে সেটি আত্মসাতের অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

এএমএল অফিসের বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগের বিষয়েও ব্যাখ্যা

থাইল্যান্ডের ১৯৯৯ সালের অর্থ পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনের ৪৮ ধারার দ্বিতীয় উপধারা অনুযায়ী, এএমএল অফিসের মহাসচিব চাইলে অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সম্পদ সাময়িকভাবে জব্দ বা অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দিতে পারেন। তবে এ ঘটনায় শুরুতেই সেই ক্ষমতা প্রয়োগ না করার কারণও ব্যাখ্যা করেছে সংস্থাটি।

উপমুখপাত্র জানান, সাধারণত এএমএল অফিস প্রথমে মূল অপরাধের তদন্ত-নথির পূর্ণতা এবং পুলিশের তদন্তের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে। পুলিশের কাছে অর্থের প্রবাহ ও সম্পদের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণের মতো পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ থাকলে মহাসচিব নিজের বিবেচনামতো ব্যবস্থা নিতে পারেন।

আবার এমন কোনো সম্পদ পাওয়া গেলে, যা পুলিশ আইনগতভাবে জব্দ বা অবরুদ্ধ করতে পারছে না, সে ক্ষেত্রে এএমএল অফিসের মহাসচিব নিজস্ব ক্ষমতাবলে সাময়িক জব্দের নির্দেশ দিতে পারেন। তবে বর্তমান মামলায় পুলিশের তদন্ত ও সম্পদ জব্দের কার্যক্রম যথেষ্ট জোরালো পর্যায়ে রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

রাষ্ট্রের নয়, ক্ষতিগ্রস্ত দাতাদের ফেরত দেওয়া হবে অর্থ

এ মামলার সম্পদ জব্দের প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জব্দ করা সম্পদ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার পরিবর্তে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের অর্থ ফেরত দেওয়ার জন্য ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।

এএমএল অফিসের উপমুখপাত্র জানান, মূলোফনিয়ায় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পদ জব্দের প্রক্রিয়া শেষ হলে মামলার নথি তৈরি করে সরকারি কৌঁসুলির কাছে পাঠানো হবে। এরপর আদালতের কাছে সম্পদসংক্রান্ত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন করা হবে।

আদালতের নির্দেশে সম্পদ থেকে অর্থ আদায় করা সম্ভব হলে তা ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে আনুপাতিক হারে বণ্টন করা হবে। এ ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে বিবেচিত হবেন সেই ব্যক্তিরা, যাঁরা ফাউন্ডেশন বা সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবে অর্থ অনুদান দিয়েছিলেন।

৯০ দিনের মধ্যে ক্ষতিপূরণের আবেদন

ক্ষতিগ্রস্ত দাতাদের অর্থ ফেরত দেওয়ার জন্য এএমএল অফিসের আইনি প্রক্রিয়ায় তাঁদের অধিকার সুরক্ষার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে। অতীতের জনসাধারণের সঙ্গে প্রতারণার কয়েকটি মামলাতেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন মন্দির, ফাউন্ডেশন ও পরিচিত সংগঠন-সংশ্লিষ্ট মামলাও রয়েছে।

এ ধরনের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা নির্ধারিত ব্যবস্থায় আবেদন করতে পারবেন। আবেদনপত্রের সঙ্গে অর্থ পাঠানোর প্রমাণ, যেমন ব্যাংক লেনদেনের রসিদ বা অর্থ স্থানান্তরের নথি জমা দিতে হবে। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর আবেদন জমা দেওয়ার জন্য ৯০ দিন সময় থাকবে।

এএমএল অফিস জানিয়েছে, বর্তমানে পুলিশের তদন্ত ও সম্পদ জব্দের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। পুলিশের কাছ থেকে সম্পদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা ও মামলার প্রয়োজনীয় নথি পাওয়ার পরই সংস্থাটি পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেবে।