রাজনৈতিক দলের হাজার কোটি টাকা আসে কোথা থেকে?

ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত সাংগঠনিক কার্যক্রমে বছরে ব্যয় হতে পারে ২ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা; সদস্যদের চাঁদা থেকে সম্ভাব্য আয় মাত্র ১১৬ কোটি। অর্থায়নে অস্বচ্ছতা, ব্যবসায়ী ও বিত্তশালীদের ওপর নির্ভরতা এবং অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের ঘাটতি চিহ্নিত করেছে টিআইবি।
টুইট প্রতিবেদক: দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনায় বছরে ব্যয় হতে পারে কয়েকশ থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা। একটি দলের সাংগঠনিক কাঠামো ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত হলে সম্ভাব্য বার্ষিক ব্যয় দাঁড়াতে পারে ১ হাজার ৫৩২ থেকে ২ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা। অথচ সদস্যদের কাছ থেকে চাঁদা সংগ্রহ করে সম্ভাব্য আয় মাত্র ১১৬ কোটি টাকা। বিপুল এই ব্যয়ের অর্থ কোথা থেকে আসে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থায়নে ব্যবসায়ী ও বিত্তশালীদের ওপর নির্ভরতা, আর্থিক হিসাবের অস্বচ্ছতা, অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের ঘাটতি এবং নেতৃত্ব নির্বাচনে অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণায়।
রোববার (১ নভেম্বর) রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে গবেষণার বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ তুলে ধরেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
সাংগঠনিক ব্যয় দুই হাজার কোটি টাকা ছাড়ানোর হিসাব
টিআইবির গবেষণায় রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন পর্যায়ের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার সম্ভাব্য ব্যয় নিরূপণ করা হয়েছে।
গবেষণা অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধনের শর্ত পূরণ করে ন্যূনতম ২২টি জেলা ও ১০১টি উপজেলায় কার্যালয় এবং কার্যক্রম পরিচালনা করতে একটি রাজনৈতিক দলের বছরে প্রায় ১৪ থেকে ২৫ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। অথচ সদস্যদের চাঁদা থেকে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ আয় মাত্র ২৬ লাখ টাকা।
অন্যদিকে, দেশের সব জেলা, মহানগর, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত সাংগঠনিক কার্যক্রম বিস্তৃত থাকলে বার্ষিক ব্যয় হতে পারে ৩০২ থেকে ৩৯৩ কোটি টাকা। এ ক্ষেত্রে সদস্যদের চাঁদা থেকে সম্ভাব্য আয় ১৪ থেকে ৩৮ কোটি টাকা।
আর ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত সাংগঠনিক শাখা বিস্তৃত হলে বার্ষিক ব্যয় দাঁড়াতে পারে ১ হাজার ৫৩২ থেকে ২ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা। বিপরীতে সদস্যদের চাঁদা থেকে সম্ভাব্য আয় মাত্র ১১৬ কোটি টাকা।
গবেষণার এই হিসাব রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক বিস্তৃতি অনুযায়ী তৈরি প্রাক্কলন। এটি কোনো নির্দিষ্ট দলের প্রকৃত ব্যয়ের হিসাব নয়। তবে সদস্যদের চাঁদার তুলনায় সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার সম্ভাব্য ব্যয়ের বড় ব্যবধান রাজনৈতিক অর্থায়নের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ব্যবসায়ী ও বিত্তশালীদের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে
টিআইবির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন ও সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার বিদ্যমান ব্যবস্থা প্রতিযোগিতামূলক পৃষ্ঠপোষকতার প্রবণতা তৈরি করছে। ফলে দলগুলো কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যবসায়ী ও বিত্তশালীদের আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
রাজনৈতিক অর্থায়নে ব্যক্তিনির্ভরতা ও অনানুষ্ঠানিক উৎসের প্রাধান্যের কারণে প্রভাবশালী দলগুলোতে ক্ষমতার অপব্যবহার, কালোটাকার প্রভাব, দুর্বৃত্তায়ন ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল বাড়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন, সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ অতিমাত্রায় অর্থনির্ভর হয়ে পড়ায় দলগুলো ব্যবসায়ী ও বিত্তশালীদের ওপর নির্ভরশীল হচ্ছে।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক অর্থায়নে ব্যক্তিনির্ভরতা ও অনানুষ্ঠানিকতার কারণে প্রভাবশালী দলগুলোতে ক্ষমতার অপব্যবহার, কালোটাকার প্রভাব, দুর্বৃত্তায়ন ও অন্তর্দ্বন্দ্ব বিকশিত হচ্ছে। এতে রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতাকেন্দ্রিক ব্যবসায়িক কাঠামোয় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
আর্থিক নীতিমালা নেই, নিরীক্ষিত হিসাবও প্রকাশিত হয় না
রাজনৈতিক দলগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনায়ও বড় ধরনের দুর্বলতা পেয়েছে টিআইবি। গবেষণায় দেখা গেছে, দলগুলোর আর্থিক নীতিমালা ও কার্যপ্রণালি বিধি নেই। গঠনতন্ত্রে সদস্যদের পদভেদে চাঁদার হার, অনুদান গ্রহণের শর্ত, মনোনয়ন ফরমের ফি, হিসাব সংরক্ষণ, আর্থিক লেনদেন, ক্রয়, নিরীক্ষা ও জবাবদিহির বিষয়ে নির্দেশনা অস্পষ্ট।
এ ছাড়া রাজনৈতিক দলগুলো নিয়মিত বার্ষিক বাজেট প্রণয়ন করে না। তাদের বার্ষিক আয়-ব্যয়ের নিরীক্ষিত প্রতিবেদনও দলীয়ভাবে কিংবা নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয় না।
ফলে দলগুলোর প্রকৃত অর্থের উৎস, অর্থ সংগ্রহের পদ্ধতি এবং ব্যয়ের খাত সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জানার সুযোগ সীমিত থাকছে। আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের অন্যতম বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি।
নেতৃত্ব নির্বাচনে পরিবারতন্ত্র ও গণতন্ত্রের ঘাটতি
রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চায়ও নানা সীমাবদ্ধতা পেয়েছে টিআইবি। অধিকাংশ দল জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে দলীয় প্রধান নির্বাচন করলেও গোপন ব্যালটের পরিবর্তে কণ্ঠভোটে নেতৃত্ব নির্বাচন করে।
দলীয় প্রধান পদে একাধিক প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতার চর্চাও সীমিত। গবেষণায় মাত্র দুটি দলে একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর তথ্য পাওয়া গেছে।
গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ১০টি রাজনৈতিক দলে পরিবারকেন্দ্রিক নেতৃত্বের নজির রয়েছে। এ ছাড়া ১২টি দলের প্রধান ১০ বছর বা তার বেশি সময় ধরে একই পদে দায়িত্ব পালন করছেন।
অধিকাংশ দলের গঠনতন্ত্রে একজন ব্যক্তি কতবার বা কত মেয়াদে দলীয় প্রধান থাকতে পারবেন, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সীমা নেই। তিনটি দলের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ এবং একটি দলের কমিটি গঠনের প্রক্রিয়াও গঠনতন্ত্রে উল্লেখ করা হয়নি।
এ ছাড়া ১৬টি দলের জাতীয় কাউন্সিল অনিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হয়। এসব কাউন্সিলে অনেক ক্ষেত্রে আগে থেকে নির্ধারিত সিদ্ধান্ত অনুমোদনের প্রবণতা দেখা যায়।
প্রার্থী মনোনয়নেও অর্থ ও প্রভাবের অভিযোগ
নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতার ঘাটতি চিহ্নিত করেছে গবেষক দল। অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা ও অযোগ্যতার শর্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই।
ছয়টি দলের গঠনতন্ত্রে জনপ্রিয়তা, সততা ও দলের প্রতি আনুগত্যের মতো বিষয় উল্লেখ থাকলেও সেগুলোর সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
গবেষণায় প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী মনোনয়নে অর্থ-প্রতিপত্তি ও ব্যবসায়ীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। তিনটি প্রভাবশালী দলে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে মনোনয়ন-বাণিজ্যের অভিযোগও পেয়েছে গবেষক দল।
পাশাপাশি বিগত পাঁচটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যবসায়ী প্রার্থী ও ব্যবসায়ী সংসদ সদস্যদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি লক্ষ্য করেছে টিআইবি।
দলীয় কার্যক্রমে নারীদের অংশগ্রহণে ঘাটতি
রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে নারীদের অংশগ্রহণ নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে সংস্থাটি।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দলীয় কার্যক্রমে নারীদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে আইনি বাধ্যবাধকতা ও অঙ্গীকার থাকলেও বাস্তবে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায় না। নারী নেতাকর্মীদের অন্তর্ভুক্তিতে অনীহা কিংবা প্রতীকী উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
তাঁর মতে, অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক চর্চা ও তৃণমূলের অংশগ্রহণের ঘাটতির কারণে রাজনৈতিক দলগুলোতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব, পরিবারতন্ত্র, কর্তৃত্বপরায়ণতা ও পুরুষতান্ত্রিকতা আরও গভীর হচ্ছে।
রাজনৈতিক দলের সুশাসনে টিআইবির ১২ সুপারিশ
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক চর্চা নিশ্চিত করতে ১২ দফা সুপারিশ করেছে টিআইবি।
সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে
১. রাজনৈতিক দলের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ এবং রাজনৈতিক দল নিবন্ধন বিধিমালা, ২০০৮ সংশোধন।
২. রাজনৈতিক দলগুলোকে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর আওতায় নিয়ে আসা।
৩. নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে দলগুলোর আর্থিক হিসাব যাচাই ও সাংগঠনিক কার্যক্রমের তদারকি বাড়ানো।
৪. আইন ও বিধিবিধান লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ।
৫. নির্বাচন কমিশনের তালিকাভুক্ত নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর আর্থিক লেনদেন নিরীক্ষা নিশ্চিত করা।
৬. দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নিয়মিত ও নির্ধারিত সময়ে জাতীয় কাউন্সিল আয়োজন।
৭. প্রতিটি পর্যায়ের নেতৃত্ব গোপন ভোটের মাধ্যমে নির্বাচন।
৮. দলীয় প্রধানসহ নেতৃত্বস্থানীয় পদে একই ব্যক্তির দায়িত্ব পালনের মেয়াদ নির্দিষ্ট করা।
৯. নেতৃত্ব নির্বাচন ও প্রার্থী মনোনয়নে নারী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
এ ছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণবিধি ও শুদ্ধাচার নীতি প্রণয়ন, অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের দলে প্রবেশ প্রতিরোধ এবং অনিয়মে জড়িত নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও করেছে সংস্থাটি।
৪২টি দলের তথ্য নিয়ে গবেষণা
গবেষণার জন্য মোট ৪২টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ করে টিআইবি। এর মধ্যে ৩৭টি নিবন্ধিত এবং পাঁচটি অনিবন্ধিত দল। এসব দলের মধ্যে ৩২টি গবেষকদের প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়েছে।
গবেষণার তথ্যের সময়সীমা ২০০৮ সালে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন কার্যক্রম শুরুর পর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। তবে ক্ষেত্রবিশেষে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্যও ব্যবহার করা হয়েছে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য অভ্যন্তরীণ সংস্কার অপরিহার্য। এ সংস্কারের দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোকেই নিতে হবে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ ও জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য দলগুলোকে নিজেদের মৌলিক সংস্কারের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থায়ন, নেতৃত্ব নির্বাচন ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দলগুলোর জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা কঠিন হবে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
তথ্যসূত্র: টিআইবির মূল গবেষণা প্রতিবেদন ও সংবাদ বিজ্ঞপ্তি।






