বাইন্যান্সে ৬৩০ কোটি ডলারের হ্যাকিং, আস্থা ফেরানোর উদ্যোগ

বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন প্ল্যাটফর্মের ইতিহাসে নজিরবিহীন সাইবার হামলা; ৩০০ কোটি ডলার উদ্ধার, বাকি অর্থের সন্ধানে তদন্ত। গ্রাহকদের ক্ষতিপূরণ দিতে নিজস্ব তহবিল ব্যবহারের ঘোষণা দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

টুইট প্রতিবেদক: বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন প্ল্যাটফর্ম বাইন্যান্সে ভয়াবহ সাইবার হামলায় ৬৩০ কোটি মার্কিন ডলার খোয়া যাওয়ার ঘটনায় বিশ্বজুড়ে ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নজিরবিহীন এই চুরির পর গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধারে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। গ্রাহকদের ক্ষতিপূরণ দিতে নিজস্ব তহবিল ব্যবহারের পাশাপাশি দ্রুত লেনদেন কার্যক্রম স্বাভাবিক করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবস ও চেইন অ্যানালিসিসের ধারণা, এই সাইবার হামলার পেছনে উত্তর কোরিয়াসংশ্লিষ্ট হ্যাকাররা জড়িত। গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যে ১০টি ভিন্ন ব্লকচেইনে থাকা বাইন্যান্সের বিভিন্ন ডিজিটাল ওয়ালেট লক্ষ্য করে অর্থ সরিয়ে নেয় হ্যাকাররা।

শুক্রবার হ্যাকিংয়ের খবর প্রকাশ্যে আসার পর ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজারে দরপতন ঘটে। একই সঙ্গে কয়েনবেস, মাইক্রোস্ট্র্যাটেজি ও রবিনহুডের মতো ক্রিপ্টোকারেন্সিসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দামও কমে যায়।তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে কাজ করছে বাইন্যান্স।

প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, চুরি যাওয়া অর্থের মধ্যে ইতোমধ্যে প্রায় ৩০০ কোটি ডলার উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। বাকি ৩৩০ কোটি ডলারের সন্ধানে বিভিন্ন অংশীদার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সঙ্গে কাজ চলছে।

বাইন্যান্সের সহ-প্রধান নির্বাহী ইয়ি হি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, উদ্ধার করা ৩০০ কোটি ডলার প্রতিষ্ঠানটির মোট ব্যবহারকারী সম্পদ ও মজুতের মাত্র ২ শতাংশ। তাঁর দাবি, গ্রাহকদের অর্থ নিরাপদ রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, গ্রাহকদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে নিজস্ব তহবিল থেকে প্রায় ৬৩৪ কোটি ডলার আলাদা করে রাখা হয়েছে। পাশাপাশি অর্থ উত্তোলনের সুবিধা প্রায় ৩৪ ঘণ্টার মধ্যে পুনরায় চালুর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে তাদের কারিগরি দল।

হামলার ধরন যেভাবে
বাইন্যান্সের সহ-প্রধান নির্বাহী রিচার্ড টেং জানিয়েছেন, এটি ছিল অত্যন্ত জটিল একটি সাইবার আক্রমণ। হ্যাকাররা ক্ষতিকর সফটওয়্যার ব্যবহার করে নিজেদের কার্যক্রমের চিহ্ন মুছে ফেলতে সক্ষম হয়েছিল। ফলে হামলা শনাক্ত করা এবং এর প্রকৃত ধরন অনুসন্ধান করা কঠিন হয়ে পড়ে।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, হ্যাকাররা লেনদেন অনুমোদনের ব্যবস্থায় কারসাজি করে প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণাধীন ইন্টারনেট-সংযুক্ত একটি ডিজিটাল ওয়ালেট থেকে অর্থ সরিয়ে নেয়। স্বাভাবিক অনুমোদন প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই এই অর্থ স্থানান্তর করা হয়েছিল।

বাইন্যান্সের প্রতিষ্ঠাতা চ্যাংপেং ঝাও জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটির মালিকানায় যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশযান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের ১০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের শেয়ার রয়েছে।

উত্তর কোরিয়ার সংশ্লিষ্টতার সন্দেহ

ব্লকচেইন বিশ্লেষকদের মতে, বাইন্যান্সে হামলার কৌশলের সঙ্গে ২০২৫ সালে ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিময় প্রতিষ্ঠান বাইবিটে সংঘটিত বড় ধরনের চুরির মিল রয়েছে। ওই ঘটনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই উত্তর কোরিয়াকে দায়ী করেছিল।

বিশ্লেষকদের ধারণা, উত্তর কোরিয়াসংশ্লিষ্ট সাইবার

গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিন ধরে গুপ্তচরবৃত্তি ও অর্থ চুরির কাজে জড়িত। তবে পিয়ংইয়ং বরাবরই এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। বাইন্যান্সের ঘটনায়ও উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ইলিপটিক ঘটনাটিকে মানব ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ চুরির ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছে। টিআরএম ল্যাবসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর প্রায় ১৫০টি পৃথক সাইবার হামলায় মোট ২৯০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি হয়েছিল।

তদন্তে যুক্ত এফবিআই ও সিক্রেট সার্ভিস

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, বাইন্যান্সে হামলার পেছনে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা জড়িত কি না, সে বিষয়ে তিনি এখনো নিশ্চিত নন। তবে তাঁর প্রশাসন বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।

হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, বাইন্যান্স জানিয়েছে, পরিস্থিতি অনেকটাই তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

এদিকে এফবিআই ও যুক্তরাষ্ট্রের সিক্রেট সার্ভিস তদন্তে যুক্ত হয়েছে। সংস্থা দুটি সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে চুরি যাওয়া অর্থ শনাক্ত, জব্দ ও উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে।

স্টেবলকয়েন ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান টেথার জানিয়েছে, তারা এই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ১৫৭ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ করেছে। অন্যদিকে সার্কল জব্দ করেছে ৮০ কোটি ডলারের বেশি সম্পদ।

বাইন্যান্সের প্রধান পরিচালন লাইসেন্স প্রদানকারী আবুধাবির আর্থিক সেবা নিয়ন্ত্রক সংস্থাও জানিয়েছে, তারা প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যোগাযোগ রাখছে এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন প্ল্যাটফর্মটির জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু চুরি যাওয়া অর্থ উদ্ধার নয়, বরং গ্রাহকদের নিরাপত্তা ও আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। নজিরবিহীন এই ঘটনার পর ডিজিটাল সম্পদের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সূত্র: রয়টার্স