বান্দরবানে বাড়ছে কাজুবাদামের চাষ, মণ ৩৫০০ টাকায় বিক্রি করেও লাভে কৃষক

পাহাড়ের মাটি ও আবহাওয়ায় মিলছে ভালো ফলন, স্থায়ী বাগানে ঝুঁকছেন চাষিরা; নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে পাহাড়ি অর্থনীতিতে
বান্দরবান প্রতিনিধি: পাহাড়ের মাটি ও আবহাওয়ার উপযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে বান্দরবানে দিন দিন বাড়ছে দেশি কাজুবাদামের চাষ। ভালো ফলন ও বাজারে চাহিদা থাকায় এ চাষে নতুন সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখছেন জেলার কৃষকরা। একসময় জীবিকার প্রধান অবলম্বন জুম চাষ হলেও এখন স্থায়ী ফলদ বাগান গড়ে তুলছেন পাহাড়ের কৃষকরা।
জেলার সব উপজেলায় কাজুবাদামের চাষ হলেও রুমা ও থানচিতে এর বিস্তার তুলনামূলক বেশি। বিশেষ করে থানচির সড়কের দুই পাশজুড়ে গড়ে উঠেছে ছোট-বড় অসংখ্য কাজুবাদামের বাগান। জ্যৈষ্ঠ মাসে এসব বাগানে লাল ও হলুদ রঙের থোকা থোকা পাকা কাজু বাদাম দেখা যায়। স্থানীয়ভাবে এটি ‘টাম’ নামে পরিচিত।
রুমার বলিপাড়া এলাকার বিদ্যামনি পাড়ার কৃষক ফোসা উ মারমা জানান, প্রায় ১২ বছর আগে কৌতূহল থেকে পাঁচ একর জমিতে কাজুবাদামের চাষ শুরু করেন তিনি। চার বছরের মধ্যেই বাগানে ফলন আসতে শুরু করে। আগে বাজারজাত করার সুযোগ না থাকায় বাগানেই নষ্ট হতো ফল। তবে বর্তমানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের লোকজন বাগানে এসে কাজুবাদাম কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
তিনি বলেন, গত বছর ৫০ মণ কাজুবাদাম বিক্রি করেছেন। চলতি বছর ফলন হয়েছে ৮০ মণ। প্রতি মণ ৩ হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি করেও লাভের মুখ দেখছেন তিনি।
থানচির কৃষক উবামং মারমা জানান, চলতি মৌসুমে তাঁর বাগানে প্রায় ৪৫ মণ কাজুবাদাম উৎপাদনের আশা রয়েছে। ইতোমধ্যে ২০ মণ বিক্রি করেছেন তিনি।
অন্যদিকে বাগানপাড়ার কর্ণজয় ত্রিপুরার বাগানে রয়েছে ২০০টি কাজুবাদামের গাছ। চলতি মৌসুমে তিনি ১০ থেকে ১২ মণ ফলনের আশা করছেন। তাঁর মতে, এলাকায় দিন দিন কাজু চাষের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। তবে শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানি ও সার সরবরাহে সরকারি সহযোগিতা বাড়ানো হলে উৎপাদন আরও বৃদ্ধি পাবে।
বাংলাদেশ এগ্রিকালচার প্রোডাক্টসের মাঠ সমন্বয়ক রেম্বো ত্রিপুরা জানান, তাঁরা কৃষকদের কাছ থেকে প্রতি মণ কাজুবাদাম ৩ হাজার ৩০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা দরে কিনছেন।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বান্দরবানে বর্তমানে ২ হাজার ৮৮২ জন কৃষক ১ হাজার ৮৩৭ হেক্টর জমিতে কাজুবাদামের চাষ করছেন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে জেলায় কাজুবাদামের উৎপাদন ছিল ১ হাজার ২১২ মেট্রিক টন। চলতি অর্থবছরে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৩২৩ মেট্রিক টন।
কাজুবাদাম চাষ সম্প্রসারণে লামা উপজেলায় বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে কৃষি বিভাগ। ইতোমধ্যে ১৬৫ জন কৃষককে বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ, চারা, সার ও কীটনাশক দেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের ফলে ১৬০ একর জমিতে ৩১ হাজার ৭৬১টি কাজুবাদামের গাছ রোপণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪ হাজার ৩০০টি গাছ থেকে এ পর্যন্ত ০.৩১ মেট্রিক টন ফলন পাওয়া গেছে।
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, কাজুবাদাম শুধু সুস্বাদু ও পুষ্টিকর বাদাম হিসেবেই নয়, বহুমুখী ব্যবহারযোগ্য কৃষিপণ্য হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। এর খোসা থেকে জৈব বালাইনাশক ও ভিনেগার তৈরি করা যায়। পাশাপাশি কাজুর ফল বা ‘কাজু অ্যাপল’ থেকে তৈরি করা সম্ভব পুষ্টিকর জুস। এ জুসে কমলালেবুর তুলনায় ছয় গুণ বেশি ভিটামিন সি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
প্রতি সাড়ে তিন থেকে চার কেজি খোসাযুক্ত কাজুবাদাম প্রক্রিয়াজাত করে প্রায় এক কেজি বাদাম পাওয়া যায়। প্রক্রিয়াজাত এসব বাদামের বাজারমূল্য ৮০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত।
বান্দরবানে প্রথম কাজুবাদামের চারা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এলএ অ্যাগ্রো লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইফতেখার সেলিম জানান, তাঁরা কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনাম থেকে ছয় লাখ উন্নত জাতের বীজ এনে চারা উৎপাদন করছেন। এর মাধ্যমে পাহাড়ে উন্নত জাতের কাজুবাদামের চাষ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, কাজুবাদামের চারা রোপণের তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে ফলন পাওয়া যায়। এ ফসলে রোগবালাইয়ের আক্রমণও তুলনামূলক কম। পাহাড়ের মাটি ও আবহাওয়া কাজু চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় কৃষকদের সার, প্রয়োজনীয় উপকরণ ও নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কাজুবাদামের চাষ সম্প্রসারণ, উন্নত জাতের চারা সরবরাহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে বান্দরবানের পাহাড়ি কৃষিতে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হবে। পাশাপাশি জুম চাষের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্থায়ী বাগানভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থার প্রসারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে এই ফসল।






