জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আন্তর্জাতিক আইন প্রণয়নে কাতারের ৫ শর্ত

জাতিসংঘের সনদভিত্তিক আন্তর্জাতিক আইনব্যবস্থা শক্তিশালী করার আহ্বান; জাতীয় সার্বভৌমত্ব, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রগুলোর ঐকমত্যের ওপর গুরুত্বারোপ।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: আন্তর্জাতিক আইন কমিশন (আইএলসি) এবং এর কার্যপরিধির প্রতি নিজেদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে কাতার। একই সঙ্গে জাতিসংঘ সনদের লক্ষ্য ও নীতির ভিত্তিতে একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক আইনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় কমিশন ও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ষষ্ঠ কমিটির সঙ্গে গঠনমূলক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আগ্রহ প্রকাশ করেছে দেশটি।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর ২০২৬) যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ষষ্ঠ কমিটির আলোচনায় কাতারের পক্ষ থেকে এ অবস্থান তুলে ধরা হয়।
এদিন ষষ্ঠ কমিটির আলোচ্যসূচির ৭৮ নম্বর বিষয় ‘আন্তর্জাতিক আইন কমিশনের ৭৬তম ও ৭৭তম অধিবেশনের কার্যক্রমবিষয়ক প্রতিবেদন’ নিয়ে আলোচনায় কাতারের প্রতিনিধিদলের সদস্য আল জাজি রশিদ আল নুয়াইমি বক্তব্য দেন।
বক্তব্যে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আইন সংকলন এবং এর ক্রমাগত উন্নয়নে আন্তর্জাতিক আইন কমিশনের যে দায়িত্ব রয়েছে, তাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয় কাতার। এ ক্ষেত্রে কমিশন ও ষষ্ঠ কমিটির মধ্যে অব্যাহত সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ষষ্ঠ কমিটি সদস্যরাষ্ট্রগুলোর জন্য কমিশনের কার্যক্রম পর্যালোচনা এবং নিজ নিজ মতামত তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মঞ্চ হিসেবে কাজ করে।
আল নুয়াইমি জোর দিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক আইন কমিশনের কার্যক্রম পরিচালিত হওয়া উচিত রাষ্ট্রগুলোর বাস্তব চর্চা ও মতামতের ভিত্তিতে। পাশাপাশি সম্ভবপর ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের আইনগত ঐতিহ্য, দৃষ্টিভঙ্গি এবং জাতীয় আইনব্যবস্থার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যকে যথাযথভাবে বিবেচনায় নিতে হবে। কমিশনের প্রণীত আইনগত দলিলগুলোর বিষয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তাঁর মতে, ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে এ ধরনের ঐকমত্য অত্যন্ত জরুরি।
জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় গুরুত্ব
আন্তর্জাতিক আইনবিষয়ক দলিল প্রণয়নের ক্ষেত্রে কাতারের পূর্বে উত্থাপিত কয়েকটি নীতিগত অবস্থানও পুনর্ব্যক্ত করেন আল নুয়াইমি।
তিনি বলেন, যেকোনো আন্তর্জাতিক আইনগত দলিলের ক্ষেত্রে জাতীয় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। রাষ্ট্রের সংবিধান ও সার্বভৌমত্বের প্রতি পূর্ণ সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যমান আন্তর্জাতিক চুক্তিতে প্রতিষ্ঠিত সংজ্ঞা ও মানদণ্ডকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
কাতারের প্রস্তাবিত নীতিগত শর্তগুলোর মধ্যে আরও রয়েছে—
১. নতুন আন্তর্জাতিক দলিল যেন বিদ্যমান আন্তর্জাতিক চুক্তি ও আইনি কাঠামোর পরিপূরক হয়।
২. আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ার রাজনৈতিক অপব্যবহার বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যবহার ঠেকাতে কার্যকর পদ্ধতিগত সুরক্ষা থাকতে হবে।
৩. প্রস্তাবিত দলিল পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণের জন্য রাষ্ট্রগুলোকে পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে।
৪. দলিলের বিষয়ে যতটা সম্ভব ব্যাপক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে হবে।
কাতারের মতে, এসব শর্ত নিশ্চিত করা গেলে আন্তর্জাতিক আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রগুলোর আস্থা এবং অংশগ্রহণ আরও শক্তিশালী হবে।
আন্তর্জাতিক মানবিক আইন বাস্তবায়নে কাতারের উদ্যোগ
আল নুয়াইমি বলেন, আন্তর্জাতিক আইন সংকলন ও ক্রমাগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রগুলোর বাস্তব কার্যক্রম ও অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আন্তর্জাতিক আইনকে সম্মান করা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এর বাস্তবায়নে সহায়তার মাধ্যমে কাতারও এ ক্ষেত্রে অবদান রাখছে।
জাতীয় পর্যায়ে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন বাস্তবায়নের জন্য কাতার একটি জাতীয় কমিটি প্রতিষ্ঠা করেছে। এই কমিটি আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের বিধান বাস্তবায়নে জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে।
এ ছাড়া আইনি প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার সঙ্গে জাতীয় আইনকানুনের সামঞ্জস্য নিশ্চিত করাও কমিটির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
কাতারের এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের নীতিমালা দেশের আইন ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠা করা।
আরব অঞ্চলে প্রথমবার স্থায়ী কমিটির সভাপতিত্ব
আঞ্চলিক পর্যায়েও আন্তর্জাতিক মানবিক আইন বাস্তবায়নে কাতারের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন আল নুয়াইমি।
তিনি জানান, কাতার আরব স্থায়ী আন্তর্জাতিক মানবিক আইন কমিটির প্রথম সভাপতিত্বকারী রাষ্ট্র হয়েছে। আরব লীগের কাঠামোর অধীনে প্রতিষ্ঠিত এই কমিটি আন্তর্জাতিক মানবিক আইন নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন আরব দেশের জাতীয় কমিটিগুলোর কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে।
এর মাধ্যমে আরব অঞ্চলে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের বিধান বাস্তবায়ন, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তায় মানবিক আইনের ভূমিকা
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন বাস্তবায়নের উদ্যোগেও কাতারের সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
আল নুয়াইমি জানান, ২০২৫ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের প্রতি রাজনৈতিক অঙ্গীকার নবায়নের লক্ষ্যে গৃহীত বৈশ্বিক উদ্যোগে যোগ দিয়েছে কাতার। এই উদ্যোগের তৃতীয় কর্মধারার সহসভাপতিত্ব করছে দেশটি। কর্মধারাটির মূল বিষয় আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও শান্তি।
কাতারের এই অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় আন্তর্জাতিক আইনের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করার অঙ্গীকার প্রতিফলিত হচ্ছে বলে জানান তিনি।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে আল নুয়াইমি বলেন, জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাতারের এসব উদ্যোগকে রাষ্ট্রীয় চর্চার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। এসব অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক আইনের ক্রমাগত উন্নয়নে অবদান রাখার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইন কমিশনের ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের জন্য নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে পারে।
তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন, আন্তর্জাতিক আইন কমিশন ও জাতিসংঘের ষষ্ঠ কমিটির সঙ্গে গঠনমূলক সহযোগিতা অব্যাহত রেখে আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা শক্তিশালী করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ কাতার।
সূত্র: কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (MOFA Qatar)।






