জাপান সফরে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা

এক চুক্তি, চার সমঝোতা স্মারক ও বেসরকারি পর্যায়ে ১৭টি স্মারক সই; প্রায় দুই লাখ কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা

টুইট ডেস্ক : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের জাপান সফরে দুই দেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে একাধিক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে প্রায় ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগ এবং প্রায় দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

সফরকালে বাণিজ্য, জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, অবকাঠামো, গভীর সমুদ্রবন্দর ও বৈদেশিক বিনিয়োগসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে সহযোগিতা বাড়াতে একমত হন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সফরের শেষ দিনে জাপানের নাগোয়া শহরে বিশ্বখ্যাত গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টয়োটার মোতোমাচি কারখানা পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। স্থানীয় সময় সকাল ১০টার দিকে তিনি কারখানায় পৌঁছে গাড়ি সংযোজনের বিভিন্ন ধাপ ঘুরে দেখেন। এ সময় টয়োটার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে টয়োটার প্রথম উৎপাদিত যাত্রীবাহী গাড়ির প্রতিরূপও পরিদর্শন করেন।

সফরের শেষ দিনেই দেশে ফেরার উদ্দেশে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীরা। তবে বাংলাদেশ বিমানের ফিরতি উড়োজাহাজে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় যাত্রা বিলম্বিত হয়। সন্ধ্যা ৬টায় উড়োজাহাজটি ছাড়ার কথা থাকলেও ত্রুটি সারানোর পর রাত ১০টা ৫৫ মিনিটে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করে।

চুক্তি ও সমঝোতায় সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরে সরকারি পর্যায়ে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে একটি চুক্তি এবং চারটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ ছাড়া বেসরকারি পর্যায়ে দুই দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৭টি সমঝোতা স্মারক এবং দুটি অনুদান চুক্তি সই হয়েছে।

তিনি জানান, বাংলাদেশের উপকূলীয় নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়াতে একটি টহলজাহাজ সরবরাহের জন্য ২১২ কোটি জাপানি ইয়েনের অনুদান চুক্তি হয়েছে। পাশাপাশি বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে প্রায় ১০৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ইয়েন ঋণ প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাপান।

উপজেলা পর্যায়ে সুশাসন ও উন্নয়ন কার্যক্রমে ১৩ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন সহায়তার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দুই দেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় যৌথভাবে কাজ করবে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে প্রায় ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এসব বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে প্রায় দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে।

বাণিজ্য ও বিনিয়োগে সম্ভাবনা

জাপানপ্রবাসী ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদেরা প্রধানমন্ত্রীর সফরকে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের সুযোগ হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, জাপানের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।

জাপানপ্রবাসী ব্যবসায়ী ও বিজিএমইএর উপদেষ্টা কাজী সারওয়ার হাবিব বলেন, জাপান প্রতিবছর প্রায় ২৫ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক আমদানি করে। অথচ বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ সেখানে প্রায় ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। তাঁর মতে, বাজারের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আরও বাড়ানো সম্ভব।

তিনি আরও জানান, বিজিএমইএতে জাপান ডেস্ক চালু হয়েছে। জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের প্রায় ৭ হাজার ৩৯৮টি পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির সদস্য বদরুল আলম চৌধুরী শিপলু বলেন, জাপানের সঙ্গে সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা কাজে লাগাতে চুক্তি ও আশ্বাসগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ে শেষ করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

জাপানপ্রবাসী বিনিয়োগকারী হোসেইন মো. সারোয়ার সানি বলেন, জাপানি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও বিনিয়োগ পরিবেশ যথাযথভাবে তুলে ধরতে হবে। এ ক্ষেত্রে দূতাবাসের কার্যক্রম জোরদার, বিনিয়োগবিষয়ক সেমিনার আয়োজন এবং জাপানি প্রযুক্তি ও আধুনিক জ্ঞান বাংলাদেশে আনার উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

সফরে অবকাঠামো উন্নয়ন নিয়েও আলোচনা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন বিভাগে উড়াল এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ এবং ছয়টি বিভাগে রেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, জাপানের সঙ্গে চুক্তি ও বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে কর্মসংস্থান, রপ্তানি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।