রিকশা চালান জীবিকার তাগিদে, বাঁশির সুরে খুঁজে পান সুখ

প্যাডেলে জীবিকার সংগ্রাম, বাঁশির সুরে খুঁজে পান জীবনের আনন্দ। একসময় ছিলেন গ্রামীণ ব্যাংকের মাঠকর্মী, এখন রিকশা চালিয়ে চলে সংসার; অবসর পেলেই ১৭টি বাঁশি নিয়ে মেতে ওঠেন সুরের জগতে।
নিজস্ব প্রতিবেদক: জীবনের পথ কখনো মসৃণ, কখনো বন্ধুর। কখনো স্বপ্নের পেছনে ছুটতে হয়, কখনো বাস্তবতার প্রয়োজনে বদলে নিতে হয় জীবনের গতিপথ। তবু কিছু মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকে এমন এক ভালোবাসা, যা ক্লান্ত জীবনের মাঝেও এনে দেয় প্রশান্তি।
মো. কোরবান আলী তেমনই একজন মানুষ। জীবিকার তাগিদে যাঁর দিন কাটে রিকশার প্যাডেলে পা রেখে, আর অবসর পেলেই যিনি হারিয়ে যান বাঁশির সুরের মায়াবী জগতে।
কোরবান আলীর জীবনের গল্পে রয়েছে সংগ্রাম, পেশা পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা আর সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগ। জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আজও তিনি খুঁজে পান বাঁশির সুরে নিজের মতো করে বেঁচে থাকার আনন্দ।
গ্রামীণ ব্যাংকের চাকরি থেকে রিকশার প্যাডেলে
কোরবান আলীর জীবনের শুরুটা ছিল অন্য রকম। ১৯৮২ সালে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর তিনি গ্রামীণ ব্যাংকে মাঠকর্মী হিসেবে চাকরি শুরু করেন। তখন তাঁর মাসিক বেতন ছিল মাত্র ৯০০ টাকা। প্রায় ছয় বছর চাকরি করার পর ১৯৮৮ সালে তিনি সেই চাকরি ছেড়ে দেন। এরপর জীবিকার প্রয়োজনে বেছে নেন রিকশা চালানোর পেশা।
সেই থেকে রিকশার প্যাডেলে পা রেখেই তাঁর জীবনসংগ্রাম চলছে। পেশা বদলালেও জীবনের প্রতি তাঁর ভালোবাসা কিংবা নিজের মতো করে আনন্দ খুঁজে নেওয়ার ইচ্ছা হারিয়ে যায়নি।
১৭টি বাঁশি, এক হৃদয়ভরা ভালোবাসা
কোরবান আলীর সবচেয়ে প্রিয় সঙ্গী বাঁশি। তাঁর সংগ্রহে রয়েছে ১৭টি বাঁশি। প্রতিটি বাঁশিই যেন তাঁর কাছে আনন্দের একেকটি উপলক্ষ। কাজের ফাঁকে কিংবা অবসর সময়ে বাঁশি হাতে তুলে নেন তিনি। এরপর নিজের মনের মতো করে বাজাতে থাকেন সুর।
প্রায় ২০ বছর ধরে বাঁশি বাজানোর সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই অভ্যাস পরিণত হয়েছে ভালো লাগার এক গভীর জায়গায়। রিকশা চালানোর ব্যস্ততা, জীবিকার চাপ কিংবা দৈনন্দিন ক্লান্তি—সবকিছুর মধ্যেও বাঁশির সুর তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় অন্য এক জগতে।
যেখানে নেই জীবিকার হিসাব, নেই প্রতিদিনের ব্যস্ততার চাপ; আছে শুধু সুরের সঙ্গে মনের একান্ত কথোপকথন।
বাঁশির সুরেই খুঁজে পান সুস্থ থাকার প্রেরণা
কোরবান আলীর বিশ্বাস, বাঁশি বাজানোর সঙ্গে তাঁর সুস্থ থাকার একটি সম্পর্ক রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বাঁশি বাজানোর পর তিনি স্বস্তি অনুভব করেন এবং নিজেকে ভালো বোধ করেন। তিনি মনে করেন, বাঁশি বাজানোর কারণেই তিনি হাঁপানির সমস্যা থেকে মুক্তি পেয়েছেন।
তবে এটি তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও বিশ্বাস। (বাঁশি বাজালে হাঁপানি সেরে যায়—এমন চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য যথেষ্ট প্রমাণ প্রয়োজন।)
তবু কোরবান আলীর জীবনে বাঁশির গুরুত্ব যে অনেকখানি, তা তাঁর কথাতেই স্পষ্ট। তাঁর কাছে বাঁশি শুধু বাদ্যযন্ত্র নয়; এটি আনন্দ পাওয়ার, মন ভালো রাখার এবং নিজের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোর মাধ্যম।
জীবনের আরেক অধ্যায় খেলনা বিক্রি
রিকশা চালানোর পাশাপাশি জীবনের একপর্যায়ে খেলনা বিক্রির কাজও করেছেন কোরবান আলী। জীবিকার প্রয়োজনে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হলেও বাঁশির প্রতি তাঁর ভালোবাসা অটুট থেকেছে।
তাঁর সংসারে রয়েছে চার সন্তান—তিন মেয়ে ও এক ছেলে। পরিবারের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁকে প্রতিনিয়ত পরিশ্রম করতে হয়। সেই পরিশ্রমের ফাঁকে বাঁশি বাজানোই যেন তাঁর নিজস্ব আনন্দের ঠিকানা।
জন্ম ভারতের মুর্শিদাবাদে, বসতি বাংলাদেশে
কোরবান আলীর জন্ম ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ছোট বেলায় ১৯৬৪ সালে কাছাকাছি সময়ে তিনি বাংলাদেশে চলে আসেন। এরপর জীবনের দীর্ঘ সময় কেটেছে এ দেশের মাটিতে, মানুষের সঙ্গে মিশে এবং জীবিকার জন্য নিরন্তর পরিশ্রম করে।
জীবনের নানা বাঁক পেরিয়ে তিনি আজও নিজের মতো করে বেঁচে আছেন। একদিকে রিকশা চালিয়ে সংসারের দায়িত্ব পালন, অন্যদিকে বাঁশির সুরে মনের আনন্দ খুঁজে নেওয়া—এই দুইয়ের সমন্বয়েই তাঁর জীবনগাথা।
যে গল্প মনে করিয়ে দেয় জীবনের সহজ সত্য
কোরবান আলীর গল্প কেবল একজন রিকশাচালকের গল্প নয়। এটি জীবনের প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের ভালো লাগাকে বাঁচিয়ে রাখার গল্প। জীবনে পেশা বদলেছে, দায়িত্ব বেড়েছে, সময়ের সঙ্গে এসেছে নানা পরিবর্তন। কিন্তু বাঁশির প্রতি তাঁর টান কমেনি।
হয়তো বড় কোনো মঞ্চ নেই, নেই দর্শকের করতালি কিংবা খ্যাতির আলো। তবু তাঁর কাছে রয়েছে ১৭টি বাঁশি আর নিজের মনের মতো করে সুর তোলার স্বাধীনতা।
দিনভর রিকশা চালিয়ে ক্লান্ত শরীর নিয়ে যখন তিনি বাঁশি হাতে তুলে নেন, তখন সেই সুরে মিশে যায় জীবনের অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম আর ভালো থাকার আকাঙ্ক্ষা।
কোরবান আলীর জীবনের এই ছোট্ট অথচ তাৎপর্যপূর্ণ গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সুখ সব সময় অর্থ, সম্পদ কিংবা বড় কোনো অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কখনো কখনো এক টুকরো বাঁশি, কয়েকটি প্রিয় সুর আর নিজের মতো করে কাটানো কিছু মুহূর্তও মানুষের জীবনে এনে দিতে পারে অনাবিল আনন্দ।
যোগাযোগ: মো. কোরবান আলী — ০১৯৬৪৯৭৭২৯৬






