সৌদিতে ১০ মাসে ১৮৮ জনের মৃত্যুদণ্ড

মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধে সবচেয়ে বেশি দণ্ড কার্যকর, মানবাধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ।

টুইট প্রতিবেদক: সৌদি আরবে চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে ১৮৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। হত্যা, মাদক পাচার ও সন্ত্রাসবাদ-সংশ্লিষ্ট অপরাধে এসব দণ্ড কার্যকর করা হয়। তবে পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অংশজুড়ে রয়েছে মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধ।

বার্তা সংস্থা এএফপির সরকারি ঘোষণাভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত সৌদি আরবে ১৮৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। এর পরদিন, ১৮ অক্টোবর, পাঁচ সৌদি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া দেশটিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনাও আলোচনায় এসেছে।

মাদক অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা বেশি

ইউরোপীয় সৌদি মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে সৌদি আরবে ১০৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তাঁদের মধ্যে ৭১ জন মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধে, ২৫ জন হত্যার দায়ে, ৯ জন রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট অপরাধে এবং তিনজন অন্যান্য অপরাধে দণ্ডিত ছিলেন।

অর্থাৎ, বছরের প্রথম ছয় মাসে কার্যকর হওয়া মৃত্যুদণ্ডের প্রায় ৬৬ শতাংশই ছিল মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধে। একই সময়ে দণ্ড কার্যকর হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৫৯ জন বিদেশি নাগরিক এবং ৪৯ জন সৌদি নাগরিক ছিলেন।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ২২ জুন প্রকাশিত

প্রতিবেদনেও মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি উঠে আসে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, ওই সময় পর্যন্ত সৌদি আরবে ৯৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে অন্তত ৬১ জন মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধে দণ্ডিত ছিলেন।

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সৌদি আরবে অন্তত ৩৫৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এ পরিসংখ্যান দেশটিতে মৃত্যুদণ্ডের ব্যাপক প্রয়োগ নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।

কোন অপরাধে মৃত্যুদণ্ড হতে পারে

সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থা শরিয়াহভিত্তিক বিধান, লিখিত আইন ও রাজকীয় আদেশের সমন্বয়ে পরিচালিত হয়। অপরাধের ধরন, প্রমাণ, পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট আইনি বিধানের ভিত্তিতে শাস্তি নির্ধারণ করা হয়।

দেশটিতে মাদক পাচার করে প্রবেশ করানো এবং বিদেশ থেকে মাদক এনে বিতরণের মতো গুরুতর অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে মাদক বিক্রির ক্ষেত্রে অপরাধের ধরন ও পরিস্থিতি অনুযায়ী কারাদণ্ড, জরিমানা কিংবা আরও কঠোর শাস্তি দেওয়া হতে পারে।

ইচ্ছাকৃত হত্যার ঘটনায় কিসাসের বিধান অনুসারে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া সম্ভব। তবে আইনি শর্ত পূরণ সাপেক্ষে নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীরা ক্ষমা করলে বা ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করলে মামলার পরিণতিতে পরিবর্তন আসতে পারে।

এ ছাড়া সন্ত্রাসবাদ, নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সহায়তার মতো গুরুতর অপরাধেও মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে।

১৮ অক্টোবর প্রকাশিত এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, পাঁচ সৌদি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠনে যোগদান, নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর গুলি চালানো এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সহায়তার অভিযোগ ছিল।

অন্যদিকে চুরি, প্রতারণা, মদ বা মাদক সেবনসহ বিভিন্ন অপরাধে শাস্তি নির্ধারণ করা হয় সংশ্লিষ্ট আইন ও অপরাধের পরিস্থিতি অনুযায়ী। এসব অপরাধে কারাদণ্ড, জরিমানা এবং অন্যান্য শাস্তির বিধান রয়েছে।

মৃত্যুদণ্ডের প্রয়োগ নিয়ে মানবাধিকার বিতর্ক

সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের ব্যাপক প্রয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো সমালোচনা করে আসছে। বিশেষ করে মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মনে করে, মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধে মৃত্যুদণ্ড আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সংস্থাটি সব ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রেই মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করে।

ইউরোপীয় সৌদি মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ১০৮ জনের মধ্যে ৮৩ জনের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃত হত্যার অভিযোগ ছিল না। সংস্থাটির মতে, এই পরিসংখ্যান মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগের পরিধি ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করে।

তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ মৃত্যুদণ্ডকে জনশৃঙ্খলা ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে বিবেচনা করে। এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, আপিলের সব সুযোগ শেষ হওয়ার পরই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

সব মিলিয়ে, চলতি বছরে সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা এবং মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধে এর ব্যাপক ব্যবহার দেশটির বিচারব্যবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে। বিশেষ করে বিদেশি নাগরিকদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কূটনৈতিক ও মানবাধিকার আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।