মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় বড় বাধা সামাজিক কলঙ্ক ও জনবল সংকট

প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে মানসিক চিকিৎসার সমন্বয়, দক্ষ জনবল নিয়োগ ও সামাজিক বৈষম্য দূর করার আহ্বান বিশেষজ্ঞদের।
টুইট প্রতিবেদক: বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সামাজিক কুসংস্কার, সচেতনতার অভাব, আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও দক্ষ জনবলের সংকট।
বিশেষ করে গ্রাম ও প্রান্তিক অঞ্চলে বিশেষজ্ঞ
চিকিৎসকের স্বল্পতা এবং সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত মনোবিজ্ঞানী না থাকায় প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন অনেকে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে মানসিক চিকিৎসার সমন্বয় এবং সেবাব্যবস্থাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাঁদের মতে, মানসিক স্বাস্থ্যকে শুধু চিকিৎসার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা, পারিবারিক সহায়তা, মানবিক মর্যাদা, পুনর্বাসন ও সামাজিকভাবে পুনঃএকীভূত হওয়ার বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
বিপুলসংখ্যক মানুষ চিকিৎসার বাইরে
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৯-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৮ বছরের বেশি বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ এবং ৭ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্যসমস্যায় ভুগছিল। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মানসিক স্বাস্থ্যসমস্যায় আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের ৯২ দশমিক ৩ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ কোনো চিকিৎসা নেয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক লজ্জা, কুসংস্কার, আর্থিক অসচ্ছলতা ও প্রয়োজনীয় সেবার অভাব এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ। মানসিক সমস্যাকে নেতিবাচকভাবে দেখার প্রবণতা দূর করা না গেলে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসার আওতায় আনা কঠিন হবে।
২০ উপজেলায় পরীক্ষামূলক উদ্যোগের পরিকল্পনা
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস ২০২৬ উপলক্ষে মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাজধানীর বাংলা একাডেমিতে আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘কমিউনিটিভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্য: অন্তর্ভুক্তিমূলক সামাজিক কল্যাণের পথ’ শীর্ষক সেমিনারটির আয়োজন করে আঁচল ফাউন্ডেশন, হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট সেন্টার, লোকাল এডুকেশন অ্যান্ড ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন এবং পল্লী একতা উন্নয়ন সংস্থা।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যকে সামগ্রিক স্বাস্থ্য, মানবাধিকার, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও জাতীয় উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। শুধু চিকিৎসাকেন্দ্রিক উদ্যোগের পরিবর্তে প্রতিরোধ, প্রাথমিক শনাক্তকরণ, চিকিৎসা, মনোসামাজিক সহায়তা ও পুনর্বাসনের সমন্বয়ে কার্যকর সেবাব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
তিনি জানান, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বিদ্যমান সেবাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ স্থাপন এবং প্রয়োজনে বিশেষায়িত কেন্দ্রে রোগী পাঠানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ২০টি উপজেলায় পরীক্ষামূলক প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে অভিজ্ঞতা ও চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে দেশব্যাপী এ সেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্য রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে দক্ষ জনবল এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; স্বাস্থ্য, সমাজকল্যাণ, মহিলা ও শিশুবিষয়ক এবং আইন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
স্বতন্ত্র অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার সুপারিশ
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের পরিচালক ও মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মো. জিয়ানুর কবির। তিনি বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মর্যাদা ও সামগ্রিক সামাজিক কল্যাণের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। এ সেবা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে ভয়, লজ্জা, কুসংস্কার ও বৈষম্য দূর করার পাশাপাশি উপজেলা ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পর্যায়ে সেবার পরিধি বাড়াতে হবে।
তিনি দক্ষ জনবল গড়ে তোলা, প্রযুক্তিনির্ভর পরামর্শসেবা চালু করা এবং শিক্ষাব্যবস্থায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা অন্তর্ভুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়ার আহ্বান জানান।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদারে তিনি পাঁচটি সুপারিশ তুলে ধরেন। এগুলো হলো—নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের জন্য মানসিক আঘাত সম্পর্কে সচেতন সহায়তা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা, স্বতন্ত্র মানসিক স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা, জেলা ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মনোবিজ্ঞানী নিয়োগ ও পদায়ন, এলাকাভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদার করা।
যুবসমাজ ও কর্মক্ষেত্রেও প্রয়োজন সচেতনতা
প্রধানমন্ত্রীর যুব কর্মসংস্থানবিষয়ক বিশেষ সহকারী মো. সাইয়েদ বিন আবদুল্লাহ বলেন, যুব উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা কেবল বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। সরকারি প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রেও সচেতনতা এবং পরামর্শসেবার সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা এবং প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি এলাকাভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী তৈরির পাশাপাশি মা ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়ার আহ্বান জানান।
মানসিক স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিটি উপজেলায় অন্তত দুজন এলাকাভিত্তিক স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের সুপারিশও করেন তিনি।
মানসিক কষ্টে সহায়তা নেওয়াকে স্বাভাবিক করতে হবে
সংসদ সদস্য শিরিন সুলতানা বলেন, শারীরিক অসুস্থতায় চিকিৎসকের সাহায্য নেওয়া যেমন স্বাভাবিক, তেমনি মানসিক কষ্ট, ভয়, উদ্বেগ কিংবা দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের সমস্যার ক্ষেত্রেও পেশাদার সহায়তা নেওয়াকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখতে হবে।
এমন পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন, যেখানে মানুষ নির্ভয়ে নিজের মানসিক কষ্টের কথা বলতে পারবেন, প্রয়োজনে পরামর্শসেবা নিতে পারবেন এবং সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার আশঙ্কা ছাড়াই সাহায্য চাইতে পারবেন।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. সাইদুর রহমান। এ ছাড়া আঁচল ফাউন্ডেশনের পরিচালক সোহেল মামুন, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অপথালমোলজির সহকারী অধ্যাপক মুস্তাইম বিল্লাহ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপপরিচালক অধ্যাপক মো. দাউদ, পল্লী একতা উন্নয়ন সংস্থার প্রধান নির্বাহী পরিচালক মো. শামীম রেজা, ডিগনিটির প্রকল্প ব্যবস্থাপক আশরাফুল আনোয়ার রোজেন, সোসাইটি ফর হেলথ প্রমোশন লিংকসের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ডা. হালিদা হানুম আখতার এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথের সহযোগী অধ্যাপক আহসান উদ্দিন বক্তব্য দেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে সর্বজনীন ও কার্যকর করতে হলে চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, দক্ষ জনবল তৈরি এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় বিপুলসংখ্যক মানুষ মানসিক স্বাস্থ্যসমস্যা নিয়ে চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তার বাইরে থেকে যাবেন।






