মহানবীর (সা.) দাম্পত্য জীবনের শিক্ষা

স্ত্রীদের প্রতি মহানবীর (সা.) আচরণ যেমন ছিল
ব্যস্ততম জীবনেও পরিবারকে সময় দিতেন, স্ত্রীর অনুভূতিকে গুরুত্ব দিতেন এবং ঘরের কাজেও সহযোগিতা করতেন মহানবী (সা.)।

টুইট প্রতিবেদক: ইসলামের নবী ও রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন মানবজাতির জন্য অনুকরণীয় আদর্শ। নবুয়তের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনা, যুদ্ধের প্রস্তুতি, সেনাবাহিনী পরিচালনা এবং বিভিন্ন শাসকের কাছে দূত পাঠানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও তিনি পালন করেছেন। এত ব্যস্ততার মধ্যেও পরিবারের সদস্যদের সময় দেওয়া এবং স্ত্রীদের অনুভূতির প্রতি যত্নশীল থাকার বিষয়টি তাঁর জীবনে বিশেষভাবে ফুটে উঠেছে।

হজরত আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনায় জানা যায়, তিনি স্ত্রীদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন এবং তাঁদের সঙ্গে আন্তরিক সময় কাটাতেন। এক রাতে আয়েশা (রা.) তাঁকে উম্মে যারের দীর্ঘ কাহিনি শোনান। কাহিনি শোনার পর মহানবী (সা.) আয়েশা (রা.)-কে বলেন, উম্মে যারের কাছে আবু যার যেমন, তোমার কাছে আমিও তেমন। এ বর্ণনা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আন্তরিকতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার গুরুত্ব তুলে ধরে।

ভালোবাসা প্রকাশে দ্বিধা করতেন না

মহানবী (সা.) স্ত্রীদের প্রতি নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করতেও দ্বিধা করতেন না। সাহাবি আমর ইবনুল আস (রা.) একবার তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, মানুষের মধ্যে তাঁর কাছে সবচেয়ে প্রিয় কে। তিনি বলেন, আয়েশা (রা.)। এরপর পুরুষদের মধ্যে কে প্রিয়—জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, আয়েশার বাবা আবু বকর (রা.)।

এ থেকে বোঝা যায়, ভালোবাসা প্রকাশ করা দাম্পত্য সম্পর্কের দুর্বলতা নয়; বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মমতা বাড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

স্ত্রীর অনুভূতির প্রতি সংবেদনশীল

স্ত্রীর মনোভাব বোঝার ক্ষেত্রেও মহানবী (সা.) ছিলেন অত্যন্ত সংবেদনশীল। আয়েশা (রা.) কখন তাঁর ওপর সন্তুষ্ট আর কখন অসন্তুষ্ট, তাও তিনি বুঝতে পারতেন। তিনি আয়েশা (রা.)-কে বলেন, তুমি যখন আমার ওপর সন্তুষ্ট থাকো, তখন ‘মুহাম্মদের প্রতিপালকের কসম’ বলো; আর অসন্তুষ্ট থাকলে ‘ইবরাহিমের প্রতিপালকের কসম’ বলো।
আয়েশা (রা.) বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, তিনি শুধু মহানবী (সা.)-এর নামটি বাদ দেন। এই ঘটনা দাম্পত্য সম্পর্কে একে অপরের অনুভূতি ও মানসিক অবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়ার অনন্য দৃষ্টান্ত।

অসুস্থ স্ত্রীকে সান্ত্বনা

স্ত্রী অসুস্থ হলে মহানবী (সা.) তাঁর পাশে থাকতেন এবং সান্ত্বনা দিতেন। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন, কোনো স্ত্রী অসুস্থ হলে তিনি তার কাছে যেতেন, ডান হাত দিয়ে অসুস্থ স্থানে হাত রাখতেন এবং আল্লাহর কাছে সুস্থতার জন্য দোয়া করতেন।

এ আচরণের মাধ্যমে অসুস্থতার সময়ে জীবনসঙ্গীর পাশে থাকা, মানসিক শক্তি জোগানো এবং তার প্রতি মমতা প্রদর্শনের শিক্ষা পাওয়া যায়।

স্ত্রীর সম্মান ও সুরক্ষায় ছিলেন সচেতন

একবার আবু বকর (রা.) মহানবী (সা.)-এর কাছে এসে দেখেন, তাঁর কন্যা আয়েশা (রা.)-এর কণ্ঠস্বর উঁচু হয়েছে। তিনি আয়েশা (রা.)-কে এ জন্য ভর্ৎসনা করেন। তখন মহানবী (সা.) তাঁদের দুজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আয়েশা (রা.)-কে সুরক্ষা দেন।

আবু বকর (রা.) চলে যাওয়ার পর মহানবী (সা.) আয়েশা (রা.)-কে সান্ত্বনা দেন এবং তাঁর মন ভালো করার চেষ্টা করেন। এতে পারিবারিক পরিস্থিতিতে স্ত্রীকে অপমান বা ভীত না করে পরিস্থিতি শান্ত রাখার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।

ঘরের কাজেও সহযোগিতা করতেন

মহানবী (সা.) ঘরের কাজকে শুধু নারীর দায়িত্ব হিসেবে দেখেননি। আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি ঘরে কী করতেন। তিনি বলেন, মহানবী (সা.) পরিবারের কাজে সহযোগিতা করতেন। নামাজের সময় হলে নামাজের জন্য চলে যেতেন।

এটি স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। সংসারের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া দাম্পত্য জীবনে সহযোগিতা ও ভালোবাসার পরিবেশ তৈরি করে।

ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার প্রতিও গুরুত্ব

মহানবী (সা.) ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারেও যত্নশীল ছিলেন। আয়েশা (রা.) জানান, তিনি ঘরে প্রবেশ করার পর মিসওয়াক দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করতেন।

পরিবারের সদস্যদের সামনে পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি থাকার বিষয়টিও তাঁর জীবনাচরণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। ইবন আব্বাস (রা.) বলেছেন, তিনি যেমন নিজের স্ত্রীর কাছ থেকে নিজের জন্য সৌন্দর্য ও পরিপাট্য আশা করতেন, তেমনি স্ত্রীর জন্যও নিজেকে পরিপাটি রাখতে পছন্দ করতেন।

হাসি-আনন্দের পাশাপাশি দ্বীনি শিক্ষাও

মহানবী (সা.) স্ত্রীদের সঙ্গে হাসি-রসিকতা করতেন এবং তাঁদের সঙ্গে আনন্দময় সময় কাটাতেন। একই সঙ্গে তাঁদের দ্বীনের শিক্ষা দেওয়া ও সৎ জীবনযাপনে উৎসাহিত করতেন।

তিনি আয়েশা (রা.)-কে কোমলতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, কোনো বিষয়ে কোমলতা থাকলে তা সুন্দর হয়; আর কোনো কিছু থেকে কোমলতা সরিয়ে নিলে তা ত্রুটিপূর্ণ হয়ে যায়।

তাঁর দাম্পত্য জীবন থেকে স্পষ্ট হয়, একটি সুন্দর পরিবার কেবল ভরণপোষণের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। সেখানে প্রয়োজন ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, পারস্পরিক বোঝাপড়া, সহযোগিতা, কোমলতা এবং একে অপরের অনুভূতির প্রতি যত্ন।

মহানবী (সা.)-এর পারিবারিক জীবন তাই মুসলিম স্বামীদের জন্য দাম্পত্য আচরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ আদর্শ। স্ত্রীকে সময় দেওয়া, তাঁর কথা শোনা, ভালোবাসা প্রকাশ করা, অসুস্থতায় পাশে থাকা, ঘরের কাজে সহযোগিতা করা এবং সম্মানজনক আচরণ, এসবই তাঁর জীবন থেকে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।