বাংলাদেশ প্রবাসী ভরসায় ফুটবলের ফাঁপা আশা

আসিয়ান কাপে তিন ম্যাচে ১৩ গোল হজম, ইন্দোনেশিয়ার কাছে ৯-২ ব্যবধানের হার দেখিয়ে দিল প্রস্তুতি, কৌশল ও ঘরোয়া কাঠামোর দুর্বলতা।

 

আসিয়ান কাপে বাংলাদেশের অভিযান শেষ হয়েছে হতাশাজনকভাবে। তিন ম্যাচের প্রতিটিতেই হেরে দলটি হজম করেছে ১৩ গোল। সর্বশেষ ম্যাচে শক্তিশালী ইন্দোনেশিয়ার কাছে ৯-২ গোলে হার বাংলাদেশের ফুটবলের বিদ্যমান দুর্বলতাগুলোকে আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে।

১৯৭৫ সালে মালয়েশিয়ার মারদেকা কাপে হংকংয়ের কাছে ৯-১ গোলে হারের পর আন্তর্জাতিক ফুটবলে আবারও এক ম্যাচে নয় গোল হজম করল বাংলাদেশ। এর আগে ১৯৭৯ সালে দক্ষিণ কোরিয়া এবং ১৯৮২ সালে ইরানের বিপক্ষেও নয় গোল করে বাংলাদেশকে হারিয়েছিল প্রতিপক্ষ।

ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের রক্ষণভাগ পুরো ম্যাচেই চাপে ছিল। প্রতিপক্ষের দ্রুত পাস, দুই প্রান্ত দিয়ে আক্রমণ এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেননি বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা। ইন্দোনেশিয়ার মিচেল বেকার একাই করেন পাঁচ গোল।

বাংলাদেশের রক্ষণে বিশেষ করে প্রতিপক্ষের প্রান্তিক আক্রমণ ঠেকানোর ক্ষেত্রে বড় দুর্বলতা দেখা গেছে। মাঝমাঠেও বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা এবং দ্রুত আক্রমণ প্রতিহত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পিছিয়ে ছিল। গোলরক্ষক মেহেদী হাসান কয়েকটি ভালো সেভ করলেও পুরো রক্ষণ কাঠামোর দুর্বলতা সামাল দিতে পারেননি।

প্রস্তুতি ও কৌশল নিয়ে প্রশ্ন?

সাবেক ফরোয়ার্ড আশরাফউদ্দিন আহমেদ চুন্নুর মতে, বাংলাদেশের ফুটবলের অন্যতম বড় সমস্যা পরিকল্পনার ঘাটতি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বড় প্রতিযোগিতার আগে মাত্র কয়েক সপ্তাহের প্রস্তুতি নিয়ে নামার প্রভাব মাঠে দেখা গেছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে অন্তত ১০ বছরের লক্ষ্য নির্ধারণের প্রয়োজন রয়েছে।

অন্যদিকে সাবেক প্লেমেকার রুম্মান বিন ওয়ালী সাব্বিরের মতে, দেশের ফুটবলের মূল দুর্বলতা কাঠামোগত। নিয়মিত প্রতিযোগিতা ও শক্তিশালী ঘরোয়া লিগের অভাবে নতুন খেলোয়াড় তৈরির ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে। প্রবাসী খেলোয়াড় বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও তাঁদের খেলার মান, যোগ্যতা ও সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স যথাযথভাবে যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে।

ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের কৌশল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে রক্ষণ জমাট না রেখে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলায় ইন্দোনেশিয়া পর্যাপ্ত জায়গা পেয়েছে। সাবেক স্ট্রাইকার জাহিদ হাসান এমিলির মতে, এমন ম্যাচে নিচু বা মাঝারি রক্ষণভাগ তৈরি করে প্রতিপক্ষের আক্রমণের জায়গাগুলো বন্ধ করা প্রয়োজন ছিল।

প্রবাসী খেলোয়াড়ই কি সমাধান?

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ জাতীয় দলে প্রবাসী ফুটবলারদের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। তাঁদের কয়েকজন ইতিবাচক পারফরম্যান্সও দেখিয়েছেন। ফারহান আলী ওয়াহিদ, শুকি ইতোফুসা ও জিদান ইউসুফের মতো খেলোয়াড়েরা নিজেদের সামর্থ্যের ছাপ রেখেছেন। বিশেষ করে শুকি ইতোফুসার গতি ও উদ্যমকে ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে শুধু প্রবাসী খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভর করে জাতীয় দলের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সম্ভব নয়। বাংলাদেশের ঘরোয়া ফুটবলের মান, খেলোয়াড় তৈরির প্রক্রিয়া, নিয়মিত প্রতিযোগিতা এবং প্রশিক্ষণব্যবস্থার উন্নতি ছাড়া জাতীয় দলের শক্তি স্থায়ীভাবে বাড়ানো কঠিন।

আলফাজ আহমেদের মতে, পেশাদার ফুটবলারের নিজের ফিটনেস ধরে রাখার দায়িত্বও রয়েছে। জাতীয় দলের শিবিরে এসে ফিটনেস ঠিক করার প্রবণতার কারণে টানা ম্যাচ খেলার মতো শারীরিক সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে না বলেও তিনি মনে করেন।

ঘরোয়া ফুটবলেই মূল প্রশ্ন?

বাংলাদেশের জাতীয় দলের দুর্বলতার সঙ্গে ঘরোয়া ফুটবলের বাস্তবতার সম্পর্ক রয়েছে। অনিয়মিত প্রতিযোগিতা, মাঠের মান, লিগের ব্যবস্থাপনা এবং খেলোয়াড় তৈরির সীমাবদ্ধতা জাতীয় দলের পারফরম্যান্সেও প্রভাব ফেলছে।

আসিয়ান কাপে মালয়েশিয়ার কাছে ৩-০, সিঙ্গাপুরের কাছে ১-০ এবং ইন্দোনেশিয়ার কাছে ৯-২ গোলে হার সেই দুর্বলতারই প্রতিফলন। নতুন কোচ টমাস ডুলির অধীনে দলটি এখনও স্থিতিশীল একাদশ ও কার্যকর কৌশল দাঁড় করাতে পারেনি।

সান মারিনোর বিপক্ষে জয় দিয়ে নতুন কোচের যাত্রা শুরু হলেও আসিয়ান কাপ ছিল তুলনামূলক কঠিন পরীক্ষার মঞ্চ। সেখানে তিন ম্যাচে তিন হার এবং ১৩ গোল হজমের পর কোচের কৌশল, খেলোয়াড় নির্বাচন ও প্রস্তুতি নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশের ফুটবলে প্রবাসী খেলোয়াড়দের অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে তাঁদের দিয়ে ঘরোয়া ফুটবলের দুর্বল কাঠামোর বিকল্প তৈরি করা সম্ভব নয়। শক্তিশালী জাতীয় দল গড়তে হলে বয়সভিত্তিক খেলোয়াড় উন্নয়ন, নিয়মিত ও মানসম্মত ঘরোয়া প্রতিযোগিতা, উন্নত প্রশিক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সমন্বয় প্রয়োজন।

ইন্দোনেশিয়ার কাছে ৯-২ গোলের হার তাই শুধু একটি ম্যাচের ফল নয়; এটি বাংলাদেশের ফুটবলের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, প্রস্তুতির ঘাটতি এবং অতিরিক্ত প্রত্যাশার মধ্যকার ব্যবধানটিও সামনে এনেছে।