বিপ্লব কুমারের নামে-বেনামে ৩৪১ হিসাব, লেনদেন ৬০ কোটি: দুদক

জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ ১ কোটি ৩ লাখ ৬২ হাজার ৪৯৭ টাকার সম্পদের তথ্য, সম্পদ বিবরণী চেয়ে নোটিশ দেবে দুদক।
টুইট ডেস্ক: ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার ও তাঁর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে থাকা ৩৪১টি ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্রোকারেজ হিসাবের মাধ্যমে প্রায় ৬০ কোটি ৮৫ লাখ টাকার লেনদেনের তথ্য পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এসব হিসাবে প্রায় ৩০ কোটি ৭২ লাখ টাকা জমা এবং ৩০ কোটি ১৩ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
একই অনুসন্ধানে বিপ্লব কুমার সরকারের জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ ১ কোটি ৩ লাখ ৬২ হাজার ৪৯৭ টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। এ কারণে তাঁর বিরুদ্ধে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশ জারির সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) দুদকের নিয়মিত মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান সংস্থার সচিব মো. সাইদুর রহমান খান। তিনি বলেন, অনুসন্ধানকালে বিপ্লব কুমার সরকারের নামে-বেনামে এবং তাঁর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়। পরে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৬(১) ধারা অনুযায়ী সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশ জারির সুপারিশ করেন। কমিশন সেই সুপারিশ অনুমোদন করেছে।
৩৪১ হিসাবে লেনদেন
দুদকের অনুসন্ধানে বিপ্লব কুমার সরকার ও তাঁর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে ২১টি ব্যাংকে ৩২৫টি হিসাবের তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া দুটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তিনটি এবং সাতটি ব্রোকারেজ হাউসে ১৩টি হিসাব রয়েছে। সব মিলিয়ে হিসাবের সংখ্যা ৩৪১টি।
এসব হিসাবের মাধ্যমে মোট ৩০ কোটি ৭২ লাখ টাকা জমা এবং ৩০ কোটি ১৩ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। জমা ও উত্তোলন মিলিয়ে মোট লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৬০ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।
দুদকের অভিযোগ, সরকারি চাকরিতে থাকাকালে ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থের উৎস আড়াল করতে বিপ্লব কুমার সরকার নিজের পাশাপাশি স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামেও বিভিন্ন হিসাব ব্যবহার করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে নামে-বেনামে সম্পত্তি কেনা, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে সম্পৃক্ত অপরাধের অভিযোগও অনুসন্ধান করছে সংস্থাটি।
সম্পদ বিবরণীর নোটিশ
দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তা সহকারী পরিচালক মো. রাসেল রনি এসব তথ্যের ভিত্তিতে বিপ্লব কুমার সরকারের বিরুদ্ধে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশ জারির সুপারিশ করেন। এরপর কমিশন সেই সুপারিশ অনুমোদন করে। নোটিশে তাঁর নামে ও বেনামে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের বিবরণ চাওয়া হবে।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, অনুসন্ধানে বিপ্লব কুমার সরকারের নামে-বেনামে জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ ১ কোটি ৩ লাখ ৬২ হাজার ৪৯৭ টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে।
২০২৫ সালে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা
এর আগে ২০২৫ সালের ৯ ডিসেম্বর বিপ্লব কুমার সরকার, তাঁর স্ত্রী হোসনেয়ারা বেগম, ভাই প্রণব কুমার সরকার এবং ভাইয়ের স্ত্রী শাহানারা বেগমের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেন আদালত। ওই সময় দুদকের আবেদনে বলা হয়েছিল, তাঁদের বিরুদ্ধে ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধভাবে অর্জিত আয়ের উৎস আড়াল, নামে-বেনামে সম্পত্তি ক্রয় এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধানাধীন রয়েছে।
২৮ ব্যাংক হিসাব ও দুটি বিও হিসাব অবরুদ্ধ
এরপর ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি বিপ্লব কুমার সরকার ও তাঁর স্ত্রী হোসনেয়ারা বেগমের নামে থাকা ২৮টি ব্যাংক হিসাব এবং দুটি বিও হিসাব অবরুদ্ধের আদেশ দেন আদালত। আদালতের আদেশ অনুযায়ী, এসবের মধ্যে বিপ্লব কুমার সরকারের নামে ছিল নয়টি ব্যাংক হিসাব ও দুটি বিও হিসাব এবং তাঁর স্ত্রী হোসনেয়ারা বেগমের নামে ছিল ১৯টি ব্যাংক হিসাব।
দুদকের আবেদনে বলা হয়েছিল, এসব হিসাব থেকে অর্থ অন্যত্র স্থানান্তর, হস্তান্তর বা বেহাত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। অর্থ স্থানান্তর বা বেহাত হয়ে গেলে পরে তা উদ্ধার করা কঠিন হতে পারে—এমন আশঙ্কায় হিসাবগুলো অবরুদ্ধের আবেদন করা হয়। আদালত দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ আদেশ দেন।
আত্মগোপন ও বিদেশে অবস্থানের তথ্য
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বিপ্লব কুমার সরকার আত্মগোপনে চলে যান। পরে তাঁর কলকাতায় অবস্থানের তথ্য বিভিন্ন প্রতিবেদনে আসে। কলকাতায় তাঁর একাধিক স্বজন বসবাস করেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বিপ্লব কুমার সরকারের বিরুদ্ধে হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলা দায়েরের তথ্য পাওয়া যায়। তাঁর বিরুদ্ধে চলমান অভিযোগ ও মামলাগুলোর বিষয়ে বিভিন্ন সংস্থা পৃথকভাবে তদন্ত ও অনুসন্ধান করছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত সেগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
সূত্র: দুর্নীতি দমন কমিশনের সচিব মো. সাইদুর রহমান খানের ২৭ সেপ্টেম্বরের ব্রিফিং; বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস); বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।






