জাতিসংঘে ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি: চুক্তি না হলে ‘ইরানকে ধ্বংস’

ইরান থেকে কিউবা, জাতিসংঘে ট্রাম্পের কড়া বার্তা। জাতিসংঘে ট্রাম্প: আমেরিকা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী।

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানের সঙ্গে চুক্তি না হলে দেশটিকে ‘ধ্বংস’ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।  তিনি কিউবাকে একটি ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করে দেশটিতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে প্রায় ৩৭ মিনিটের ভাষণে তিনি ইরান, কিউবা, ভেনেজুয়েলা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জাতিসংঘ ও মার্কিন অর্থনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন।

জাতিসংঘের সাধারণ বিতর্ক ২২ সেপ্টেম্বর শুরু হয়েছে এবং ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে। বিশ্বের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা এতে বক্তব্য দিচ্ছেন।

আমেরিকা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী

ভাষণের শুরুতেই ট্রাম্প তাঁর প্রশাসনের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও সামগ্রিক সক্ষমতা বেড়েছে বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘আমেরিকা ফিরে এসেছে এবং আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী।’

শেয়ারবাজার, বিদেশি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিভিন্ন পরিসংখ্যান তুলে ধরে নিজের প্রশাসনের সাফল্যের কথা বলেন তিনি। হোয়াইট হাউসও ভাষণ-পরবর্তী বিবৃতিতে ট্রাম্পের বক্তব্যকে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক নীতির ওপর জোর দেওয়ার অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে।

ইরান নিয়ে সবচেয়ে কঠোর বার্তা

ট্রাম্পের ভাষণের বড় অংশজুড়ে ছিল ইরান। তিনি দাবি করেন, তাঁর প্রশাসন ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ঠেকিয়েছে এবং দেশটির ওপর অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখার কথা বলেন।

বিশ্বের দেশগুলোকে ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও বিচ্ছিন্নতায় যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

ট্রাম্প বলেন, আগামী মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি হতে পারে। তবে চুক্তি না হলে ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন তিনি। রয়টার্স ও এপি তাঁর বক্তব্যকে ইরানকে ‘ধ্বংস’ বা ‘annihilate’ করার হুমকি হিসেবে উদ্ধৃত করেছে।
ইরানের প্রতিনিধিরা ট্রাম্পের বক্তব্যের সময় অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেন বলে এপি জানিয়েছে।

কিউবাকে ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ বললেন

কিউবার সরকারব্যবস্থারও কঠোর সমালোচনা করেন ট্রাম্প। তিনি কিউবাকে একটি ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করে দেশটিতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
ট্রাম্পের বক্তব্যের সময় কিউবার প্রতিনিধিদল অধিবেশন কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায় বলে রয়টার্স জানিয়েছে।

তিনি একই সঙ্গে পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও স্বার্থের বিরুদ্ধে কোনো হুমকি বরদাশত না করার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে ভিন্ন অবস্থান

ভাষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও কথা বলেন ট্রাম্প। এআই নিয়ে অতিরিক্ত ভয় বা নিয়ন্ত্রণের সমালোচনা করে তিনি প্রযুক্তিটির সম্ভাবনার ওপর জোর দেন।

তিনি ‘Artificial Intelligence’ নামটির পরিবর্তে ‘Super Intelligence’ ব্যবহারের পক্ষে মত দেন এবং এআই প্রযুক্তিতে নেতৃত্বকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরেন।

জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে সমালোচনা

জাতিসংঘের ব্যয়, আমলাতান্ত্রিক কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ট্রাম্প। তিনি জাতিসংঘের বাজেট ও আমলাতন্ত্র কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসিরও সমালোচনা করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সার্বভৌম সিদ্ধান্তের গুরুত্ব বিশেষভাবে উঠে আসে।

শান্তির দাবির পাশাপাশি শক্তির বার্তা

ভাষণে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংঘাতের অবসানের কথাও বলেন ট্রাম্প। গাজা ও ইউক্রেনসহ বিভিন্ন সংঘাতের ক্ষেত্রে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের কথা তুলে ধরে নিজেকে সংঘাত নিরসনের পক্ষে থাকা নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেন তিনি।
তবে একই বক্তব্যে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক হুমকি এবং বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যবস্থার সমালোচনা করায় ভাষণের বড় বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে শক্তি প্রয়োগ ও চাপের নীতি।

ফলে ৮১তম সাধারণ পরিষদের প্রথম দিনের অন্যতম আলোচিত ভাষণে ট্রাম্প একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতার দাবি তুলে ধরেছেন, অন্যদিকে ইরান ও কিউবার মতো দেশের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।

৩৭ মিনিটের ভাষণে ট্রাম্পের মূল বার্তা ছিল—যুক্তরাষ্ট্র তার জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা রক্ষায় শক্ত অবস্থান নেবে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সেই অবস্থান বাস্তবায়নে চাপ প্রয়োগ থেকে পিছপা হবে না।