বিশ্বজুড়ে ডিজেলসংকট ২০২৭ সালেও থাকতে পারে: রয়টার্সের সতর্কবার্তা

ছবি: প্রতীকী

ইরান ও ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে; বাংলাদেশেও জ্বালানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরান ও ইউক্রেনের যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে যে ডিজেলসংকট তৈরি হয়েছে, তা ২০২৭ সালেও সহজে কাটবে না বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষক ও শিল্পসংশ্লিষ্টরা। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়া থেকে ডিজেল সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে। এতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি বাজারে পৌঁছাতে পারছে না। একই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ডিজেলের মজুদ ঐতিহাসিকভাবে নিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে খুচরা ডিজেলের দাম চলতি মাসে প্রথমবারের মতো প্রতি গ্যালন ৬ ডলার ছাড়িয়েছে। ইউরোপ ও এশিয়ার মজুদও পাঁচ বছরের গড়ের চেয়ে অনেক নিচে। স্টোরেজ ব্রোকার প্রতিষ্ঠান দ্য ট্যাংক টাইগারের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর আমেরিকার শোধনাগার ও ব্যবসায়ীরা ডিজেল সংরক্ষণের জন্য নেওয়া গুদামের লিজ নবায়ন করছেন না। কারণ সংরক্ষণ করার মতো পর্যাপ্ত ডিজেলই পাওয়া যাচ্ছে না। মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ইআইএ) পূর্বাভাস দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে ডিস্টিলেট (ডিজেলসহ) মজুদ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের শেষ পর্যন্ত এবং ২০২৭ সালের বেশিরভাগ সময় পাঁচ বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়ের নিচে থাকবে।

বাংলাদেশের পরিস্থিতি

বাংলাদেশেও এই বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব স্পষ্ট। দেশটি ডিজেলের প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর। বছরে প্রায় ৪৫ লাখ টন ডিজেল আমদানি করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালীতে শিপিং বিঘ্নিত হওয়ায় সরবরাহ ব্যয় ও দাম দুটোই বেড়েছে।

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে (১৭.৪ শতাংশ বৃদ্ধি)। পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা হয়েছে। এটি দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ দাম।

তবুও সরকার এখনও ভর্তুকি দিচ্ছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ডিজেল কিনছে প্রায় ২০৫ টাকা লিটারে, আর বিক্রি করছে ১৩৫ টাকায়। অর্থাৎ প্রতি লিটারে প্রায় ৭০ টাকা লোকসান। মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির লোকসান হয়েছে প্রায় ২২,৮৭৫ কোটি টাকা। দাম না বাড়ালে শুধু ডিজেলেই বছরে লোকসান ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেত বলে জানিয়েছেন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম আমিত।

অর্থনীতিতে প্রভাব

ডিজেল বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। পরিবহন, কৃষি (সেচ পাম্প), শিল্প (বিশেষ করে পোশাক খাতের ব্যাকআপ জেনারেটর) এবং খাদ্য উৎপাদন—সবখানেই এর ব্যবহার বেশি। দাম বাড়ায় ইতিমধ্যে কিছু রুটে বাস ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে পরিবহন মালিকরা। কৃষি ও শিল্প উৎপাদন খরচ বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত খাদ্য ও দৈনন্দিন পণ্যের দামে চাপ তৈরি করতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক সংকট ২০২৭ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশেও জ্বালানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চাপ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। সরকারের চ্যালেঞ্জ হলো ভর্তুকি কমানো এবং সরবরাহ নিশ্চিত রাখা—একই সঙ্গে ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ কমানো।

বিশ্ববাজারে ডিজেল সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশসহ আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে এই চাপ অব্যাহত থাকবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।