টিকাদানে ছন্দপতনে বাংলাদেশে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে হাম

টুইট ডেস্ক: দেশে ছয় মাসে হামে আক্রান্তের সন্দেহজনক সংখ্যা ১ লাখ ৭৫ হাজার ছাড়িয়েছে, মৃত্যু হয়েছে সহস্রাধিক মানুষের। বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদানের হার কমে যাওয়া, অপুষ্টি ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বাংলাদেশে হাম আবারও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। দীর্ঘদিন টিকাদান কর্মসূচিতে সাফল্যের পর সাম্প্রতিক সময়ে টিকার আওতা কমে যাওয়ায় দেশটিতে এই সংক্রামক রোগের বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে অন্তত ১ লাখ ৭৫ হাজার ১৯৮ জনের হামে আক্রান্ত হওয়ার সন্দেহ করা হচ্ছে। একই সময়ে হামে আক্রান্ত হয়ে বা হামের উপসর্গ নিয়ে ১ হাজার ৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত ও মৃতদের বড় অংশই দুই বছরের কম বয়সী শিশু, যাদের অনেকেই হামের টিকা পায়নি।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, প্রকৃত আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। বিশেষ করে প্রান্তিক ও গ্রামাঞ্চলের অনেক ঘটনা সরকারি পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত না হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। সাধারণত জ্বর, সর্দি ও শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দিলেও গুরুতর অবস্থায় নিউমোনিয়া কিংবা মস্তিষ্কে সংক্রমণের মতো জটিলতা তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো জনগোষ্ঠীকে হামের ব্যাপক সংক্রমণ থেকে সুরক্ষিত রাখতে সাধারণত অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় রাখা প্রয়োজন। টিকাদানের হার কমে গেলে ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
কয়েক দশক ধরে টিকাদান কর্মসূচিতে বাংলাদেশের সাফল্য আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। ২০১৯ সালে দেশে হামের প্রথম ডোজের টিকা নেওয়ার হার ছিল ৯৭ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজের হার ৯৩ শতাংশ। তবে পরবর্তী সময়ে টিকাদান ব্যবস্থায় নানা ধরনের ব্যাঘাত দেখা দেয়।
২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারির কারণে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে প্রভাব পড়ে। এরপর ২০২৪ সালে টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় পরিবর্তন এবং বিভিন্ন কারণে অতিরিক্ত টিকাদান কর্মসূচিতে বিলম্ব ঘটে। মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী ও টিকা সরবরাহ ব্যবস্থাতেও এর প্রভাব পড়ে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
ইউনিসেফের হিসাবে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে হামের টিকার আওতা ৮৬ শতাংশে নেমে আসে। প্রায় চার লাখ শিশু প্রয়োজনীয় সব ডোজ থেকে বঞ্চিত হয় এবং প্রায় ৭০ হাজার শিশু কোনো টিকাই পায়নি।
এর সঙ্গে শিশুদের অপুষ্টি, ঘনবসতিপূর্ণ শহুরে পরিবেশ এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
তবে বাংলাদেশে বর্তমান হাম পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হাম সংক্রমণের কারণ এক নয় বলে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে টিকা সরবরাহ ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় ব্যাঘাতকে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে টিকা নিতে অনীহা ও ভুল ধারণাকে সংক্রমণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে লক্ষ্য করে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, এই কর্মসূচির মাধ্যমে টিকাবঞ্চিত শিশুদের সুরক্ষার আওতায় আনা গেলে হাম সংক্রমণের গতি কমানো সম্ভব হবে।






