রাজশাহীতে ফসলের সারে ভাগ বসাচ্ছে পুকুর, কাটছে না সংকট

বরাদ্দ স্বাভাবিক থাকার পরও কৃষকের হাহাকার, ফসলের সারেই পুকুরের চাহিদা মেটানোর অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজশাহীতে রাসায়নিক সারের বরাদ্দ স্বাভাবিক থাকলেও মাঠপর্যায়ে সংকট কাটছে না। কৃষকদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে সার কিনতে হচ্ছে, কোথাও কোথাও সারের দাবিতে বিক্ষোভও হয়েছে। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, আগাম সার কেনা, চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত মজুত এবং অনিয়মের পাশাপাশি মাছের পুকুরেও ফসলের জন্য বরাদ্দ সার ব্যবহার হওয়ায় সংকট আরও তীব্র হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি সেপ্টেম্বর মাসে রাজশাহীতে ৫ হাজার ১৮৬ মেট্রিক টন ইউরিয়া, ১ হাজার ৪৫ টন টিএসপি, ১ হাজার ৬২৯ টন এমওপি ও ৩ হাজার ১৫ টন ডিএপি বরাদ্দ রয়েছে। গত বছরের একই সময়ে ইউরিয়া ৫ হাজার ৬৭ টন, টিএসপি ১ হাজার ৭৩ টন, ডিএপি ২ হাজার ৫২১ টন ও এমওপি ১ হাজার ৬০৯ টন বরাদ্দ ছিল। অর্থাৎ মৌসুমের একই সময়ে সারের মোট বরাদ্দে বড় ধরনের ঘাটতি নেই।

তবুও চলতি বছর জেলার বিভিন্ন এলাকায় সারের জন্য কৃষকদের মধ্যে হাহাকার দেখা দিয়েছে। গত ৭ সেপ্টেম্বর পুঠিয়ার বানেশ্বরে অতিরিক্ত সার বরাদ্দের দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন কৃষকেরা। এর আগে আগস্টের শুরু থেকেই জেলার বিভিন্ন স্থানে কৃষকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে সার সংগ্রহ করতে দেখা গেছে।

কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, আগামী মাস থেকে রাজশাহীতে আলু চাষ শুরু হবে। আলু চাষে তুলনামূলক বেশি সার প্রয়োজন হওয়ায় অনেক কৃষক আগাম সার কিনে রাখছেন। আবার সার পাওয়া যাবে না—এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ায় প্রয়োজন না থাকলেও অনেকে সার কিনে মজুত করছেন। কোথাও কোথাও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অতিরিক্ত সার নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে মাছের পুকুর। রাজশাহীতে প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে ৫০ হাজারের মতো পুকুর রয়েছে। মাছের প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরিতে এসব পুকুরে ইউরিয়া ও টিএসপি সার ব্যবহারের পরামর্শ দেন মৎস্য কর্মকর্তারা। কিন্তু পুকুরের জন্য পৃথক সার বরাদ্দ না থাকায় ফসলের জন্য নির্ধারিত বরাদ্দ থেকেই এ চাহিদা মেটানো হচ্ছে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম জানান, প্রতি শতক পুকুরে প্রতিদিন ১০ গ্রাম করে ইউরিয়া ও টিএসপি সার প্রয়োজন হয়। সে হিসাবে রাজশাহীতে পুকুরের জন্য প্রতি মাসে ১ হাজার ৩৩৪ দশমিক ৩৭ মেট্রিক টন ইউরিয়া এবং একই পরিমাণ টিএসপি প্রয়োজন। প্রতিবছর পুকুরে সারের প্রয়োজনীয়তার হিসাব করে মন্ত্রণালয়ে চাহিদা পাঠানো হয়।

তবে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোস্তফা কামাল হোসেন বলেন, পুকুরের জন্য আলাদা সার বরাদ্দ দেওয়া হয় না। ফসলের জন্য বরাদ্দ করা সার থেকেই পুকুরের চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে। তার মতে, সার সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ এটি।

সেপ্টেম্বরের বরাদ্দের হিসাবেও বিষয়টি স্পষ্ট। এ মাসে বরাদ্দ করা ৫ হাজার ১৮৬ মেট্রিক টন ইউরিয়ার মধ্যে পুকুরের চাহিদা ১ হাজার ৩৩৪ মেট্রিক টন। এই পরিমাণ বাদ দিলে ফসলের জন্য থাকে প্রায় ৩ হাজার ৮৫২ মেট্রিক টন। অন্যদিকে টিএসপির বরাদ্দ যেখানে মাত্র ১ হাজার ৪৫ টন, সেখানে পুকুরের মাসিক চাহিদাই ১ হাজার ৩৩৪ মেট্রিক টন। অর্থাৎ বরাদ্দ করা টিএসপি দিয়ে পুকুরের চাহিদাই পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরিতে ডিএপি ও এমওপি সারের প্রয়োজন হয় না।

এদিকে সারের মজুত পরিস্থিতি দেখতে ৮ সেপ্টেম্বর সকালে রাজশাহী নগরের নওদাপাড়া এলাকায় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের সার গুদাম পরিদর্শন করেন বিভাগীয় কমিশনার ইউসুফ আলী। পরে তিনি জানান, বাংলাদেশ রাসায়নিক শিল্প করপোরেশনের বাফার গুদামে ৯ হাজার ৮০৪ টন ইউরিয়া, ৪৩০ টন টিএসপি ও ৮৫ দশমিক ৫ টন ডিএপি মজুত রয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের গুদামে রয়েছে ৬ হাজার ৩১২ টন টিএসপি, ৮০১ টন এমওপি ও ৪ হাজার ৩৪৮ টন ডিএপি।

বিভাগীয় কমিশনারের দাবি, চলতি মাসে কৃষকের সারের চাহিদা হিসাব করেই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং জেলায় কোনো ধরনের সারের সংকট নেই। তবে মাঠের বাস্তব চিত্র বলছে, সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও কৃষকের কাছে সার পৌঁছানো নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। আগাম মজুত, অনিয়ম ও পুকুরে ফসলের সার ব্যবহারের বিষয়গুলো কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে বরাদ্দ স্বাভাবিক থাকলেও মাঠপর্যায়ে সংকটের অভিযোগ কাটবে না।