স্ত্রীকে সুস্থ করে তুলতে ছুটেছেন স্বামী, তবু অর্থের কাছে থমকে গেছে চিকিৎসা

দুই কিডনি নষ্ট, সপ্তাহে দুই দিন ডায়ালাইসিস দরকার হলেও অর্থাভাবে হচ্ছে একদিন। বড় ভাইয়ের কিডনি মিলেছে, কিন্তু ১৫ লাখ টাকার অভাবে থমকে আছে প্রতিস্থাপন। মায়ের সুস্থতার অপেক্ষায় দুই মেয়ে।

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী: আলমারির ওপর জমেছে ধুলো। ঘরের এক কোণে মাকড়সা জাল বুনেছে। বিছানায় শুয়ে সেসবই দেখেন হাসিনা পারভীন বিউটি (৪৬)।

ইচ্ছে হয় উঠে ঘরটা পরিষ্কার করেন, ধুলো মুছে দেন, সংসারের চেনা কাজগুলোতে ফিরে যান। কিন্তু পারেন না। দুই কিডনি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘ চিকিৎসার পর এখন বিছানাই তাঁর নিত্যসঙ্গী।

রাজশাহী কলেজ থেকে রসায়নে স্নাতকোত্তর করা বিউটির জীবন একসময় ছিল কর্মব্যস্ত ও স্বাভাবিক। স্বামী সাংবাদিক মো. বদরুল হাসান পেশার কাজে ব্যস্ত থাকতেন। দিনের বড় একটি সময় সংবাদ সংগ্রহে বাইরে কাটত তাঁর। সংসার, সন্তানদের পড়াশোনা এবং ঘরের যাবতীয় দায়িত্ব হাসিমুখে নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন বিউটি। আজ সেই মানুষটিই নিজের চিকিৎসার জন্য অন্যের সহায়তার অপেক্ষায়।

চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী বিউটির সপ্তাহে দুই দিন ডায়ালাইসিস প্রয়োজন। কিন্তু অর্থসংকটে নিয়মিত দুই দিন ডায়ালাইসিস করানো সম্ভব হচ্ছে না। অর্থের অভাবে বর্তমানে সপ্তাহে মাত্র একদিন ডায়ালাইসিস করিয়েই কোনোভাবে চিকিৎসা চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এতে শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি প্রতিদিন বাড়ছে অনিশ্চয়তা।

তবে বিউটিকে সুস্থ করে তোলার একটি সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। তাঁর বড় ভাই হারুন অর রশিদ বোনকে কিডনি দিতে প্রস্তুত। প্রয়োজনীয় পরীক্ষায় তাঁর কিডনিও মিলেছে। অর্থাৎ কিডনি প্রতিস্থাপনের একটি সম্ভাব্য পথ তৈরি হলেও এখন সবচেয়ে বড় বাধা অর্থ।

চিকিৎসার আশায় ভারতের শহর থেকে শহরে
স্বামীর আয়ের অর্থ, পরিবারের সঞ্চয় এবং স্বজনদের সহযোগিতা—সবকিছু একত্র করেও বিউটির চিকিৎসার ব্যয় সামাল দেওয়া সম্ভব হয়নি। প্রিয় মানুষটিকে সুস্থ করে তোলার আশায় ইতোমধ্যে তাঁকে একাধিকবার দেশের বাইরে নিয়ে যেতে হয়েছে। ভারতের এক শহর থেকে আরেক শহরে চিকিৎসার সন্ধানে ছুটেছেন তিনি; হাসপাতাল, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ, ওষুধ, যাতায়াত ও থাকা-খাওয়ার খরচ—প্রতিটি ধাপেই ব্যয় হয়েছে বিপুল অর্থ।

দীর্ঘদিন ধরে চলা এই চিকিৎসাযাত্রা পরিবারের ওপর শুধু আর্থিক চাপই সৃষ্টি করেনি, কেড়ে নিয়েছে তাদের স্বস্তি, সঞ্চয় ও ভবিষ্যতের নিরাপত্তাও।

বিউটিকে বাঁচিয়ে রাখার আশায় স্বামী ও পরিবারের সদস্যরা নিজেদের প্রয়োজন, স্বপ্ন এবং সঞ্চয়ের কথা ভুলে একের পর এক অর্থের ব্যবস্থা করেছেন। স্বজনদের কাছ থেকে সহযোগিতা নিয়েছেন, ধার করেছেন, যা কিছু সঞ্চিত ছিল তা চিকিৎসায় ব্যয় করেছেন। কিন্তু দীর্ঘ চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে এখন তাঁদের নিজেদের ও পরিবারের প্রায় সব অর্থই শেষ হয়ে গেছে।

একসময় যে পরিবারটি প্রিয়জনের সুস্থতার আশায় লড়াই করছিল, আজ তারা দাঁড়িয়ে আছে নিঃস্বতার দ্বারপ্রান্তে—তবু বিউটিকে হার মানতে দিতে চান না।

পরিবারের সামর্থ্য অনুযায়ী গয়না বিক্রি করেও প্রায় তিন লাখ টাকা জোগাড় করা হয়েছে। কিন্তু চিকিৎসার বিপুল ব্যয়ের তুলনায় সেই অর্থ সামান্য। কিডনি প্রতিস্থাপনসহ পরবর্তী চিকিৎসার জন্য এখন প্রয়োজন প্রায় ১৫ লাখ টাকা।

মায়ের অপেক্ষায় দুই মেয়ে

বিউটির ঘরে এখন সবচেয়ে বেশি সময় কাটে তাঁর দুই মেয়ের। অসুস্থ মায়ের পাশে বসে থাকে তারা। মাকে বিছানায় পড়ে থাকতে দেখে তাদেরও মন খারাপ হয়। যে মা একসময় সংসার সামলাতেন, সন্তানদের পড়াশোনার খোঁজ রাখতেন, তাদের প্রয়োজনের কথা সবার আগে ভাবতেন—আজ সেই মাকেই সারাক্ষণ বিছানায় পড়ে থাকতে হচ্ছে।

বিউটির বড় মেয়ে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে। মায়ের অসুস্থতার কঠিন সময়ের মধ্যেও পড়াশোনায় এমন সাফল্য অর্জন করেছে সে। ছোট মেয়ে পড়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে।

কিন্তু ছোট মেয়েটির কাছে মায়ের সুস্থ হয়ে ওঠার চাওয়াটা খুব সাধারণ—অথচ ভীষণ আবেগের।

সে আবার চায়, মা তাকে বকবেন। চুলে তেল দিয়ে সুন্দর করে ঝুঁটি করে দেবেন। নখে নেলপালিশ লাগিয়ে দেবেন। মায়ের সঙ্গে আগের মতো গল্প করবে, খেলবে। তার কাছে বড় কোনো চাওয়া নেই—শুধু মাকে আগের মতো সুস্থ দেখতে চায়।

বিছানায় শুয়ে থাকা বিউটিও হয়তো প্রতিদিন সেই স্বাভাবিক দিনগুলোর কথাই ভাবেন। যে হাতে সংসার গুছিয়েছেন, সন্তানদের বড় করেছেন, সেই হাত আবার কবে ঘরের কাজে ফিরবে—জানেন না তিনি।

১৫ লাখ টাকার অপেক্ষায় চিকিৎসা

এখন বিউটির কিডনি প্রতিস্থাপনসহ পরবর্তী চিকিৎসার জন্য সব‌মি‌লি‌য়ে প্রয়োজন প্রায় ১৫ লাখ টাকা। এই অর্থ তাঁর জীবনের জন্য অত্যন্ত জরুরি। চিকিৎসা অব্যাহত রাখা এবং কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব না হলে তাঁর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হতে পারে।

কিন্তু একজন সাংবা‌দিকতার উপার্জন ও নিঃস্ব হয়ে পড়া পরিবারটির পক্ষে এই অর্থ জোগাড় করা এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিকিৎসার প্রতিটি দিন তাঁদের কাছে যেমন আশার, তেমনি গভীর উদ্বেগেরও। অর্থের অভাবে যেন বিউটির চিকিৎসা থেমে না যায়—এই ভয় তাঁদের প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়াচ্ছে।

একজন মানুষের জীবন কখনো কখনো একটি পরিবারের পুরো পৃথিবী। বিউটিও তেমনই একজন—কারও স্ত্রী, কারও মা, কারও বোন। তাঁর বড় মেয়ে সাফল্যের নতুন পথে পা বাড়িয়েছে, ছোট মেয়ে এখনো মায়ের হাত ধরে বড় হতে চায়। দুই মেয়ের জীবনে মায়ের প্রয়োজন আজও আগের মতোই।
পরিবারটির আবেদন, রাজশাহীসহ দেশের হৃদয়বান মানুষ, প্রবাসী বাংলাদেশি, সামর্থ্যবান ব্যক্তি, দাতব্য প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও মানবিক সংগঠনগুলো যেন বিউটির চিকিৎসায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন।

হয়তো কারও সামান্য সহায়তাই এই পরিবারের কাছে হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় আশার আলো। ফিরিয়ে দিতে পারে দুই মেয়ের মাকে, একজন স্বামীর জীবনসঙ্গীকে এবং একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবন।

সহায়তার জন্য যোগাযোগ
বিকাশ ও নগদ: ০১৭১৮১০৫৪৬৪
ব্যাংক হিসাব: ১১০১০০৭৪০৭৯৮০
হিসাবের নাম: মো. বদরুল হাসান
ব্যাংক: যমুনা ব্যাংক, রাজশাহী ব্রাঞ্চ

এই কঠিন সময়ে সমাজের সহৃদয় মানুষ, প্রবাসী বাংলাদেশি, দাতব্য প্রতিষ্ঠান ও সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের কাছে পরিবারের আকুল আবেদন—বিউটির চিকিৎসার জন্য যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিন।

আপনাদের সামান্য সহায়তাও তাঁর চিকিৎসার পথে বড় আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে। সম্মিলিত মানবিক সহযোগিতায় হয়তো বিউটি ফিরে পেতে পারেন সুস্থ জীবনের সুযোগ, আর তাঁর দুই মেয়ে ফিরে পেতে পারে সেই মাকে—যার জন্য আজও তারা অপেক্ষা করছে।

তাদের চাওয়া একটাই—মা আবার সুস্থ হয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ান, আগের মতো ঘর গোছান, মেয়েদের চুলে তেল দিয়ে ঝুঁটি করে দেন।