সালমান শাহর মৃত্যু: তিন দশকেও কাটেনি রহস্য

আত্মহত্যা নাকি হত্যাকাণ্ড-তিন তদন্তে আত্মহত্যার কথা, দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ফের হত্যা মামলা; নতুন তদন্তে জট খোলার অপেক্ষা
টুইট ডেস্ক: ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার ইস্কাটনের ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল জনপ্রিয় চিত্রনায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন ওরফে সালমান শাহর মরদেহ। দেখতে দেখতে কেটে গেছে তিন দশক। কিন্তু তার মৃত্যুকে ঘিরে সেই পুরোনো প্রশ্নের এখনো সুরাহা হয়নি—সালমান শাহ কি আত্মহত্যা করেছিলেন, নাকি তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছিল?
মৃত্যুর পর প্রথমে অপমৃত্যুর মামলা হয়। পরবর্তী সময়ে পরিবারের পক্ষ থেকে এটিকে হত্যাকাণ্ড দাবি করে তদন্তের দাবি জানানো হয়। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় তিনটি পৃথক তদন্তে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হলেও পরিবারের আপত্তি ও ধারাবাহিক আইনি লড়াইয়ের পর মামলাটি নতুন করে হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।
দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। নতুন মামলায় সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী সামীরা হকসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে। সম্প্রতি মামলার এক আসামি খলনায়ক আশরাফুল হক ডন গ্রেপ্তার হওয়ায় নতুন করে আশাবাদী হয়েছে সালমানের পরিবার।
গত ৯ আগস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ডনকে গ্রেপ্তার করে অভিবাসন পুলিশ। পরে তাকে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়। আদালত তার পাঁচ দিনের জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিলেও তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এখনো তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি।
মামলার তদন্ত প্রতিবেদন গত ৩০ আগস্ট জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তা পারেনি সিআইডি। পরে ঢাকার মহানগর হাকিম জুয়েল রানা প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন।
সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী বর্তমানে লন্ডনে রয়েছেন। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, এবার তদন্ত শেষ হবে এবং পরিবার ন্যায়বিচার পাবে। একই সঙ্গে দেশে থাকা অন্য আসামিদের এখনো গ্রেপ্তার না করায় প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
মামলার বাদী ও সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম বলেন, তারা চান সব আসামিকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক এবং দ্রুত বিচার শেষ করা হোক। তার দাবি, মামলার মূল আসামিদের মধ্যে সালমানের সাবেক স্ত্রী সামীরা হক ও তার মা-বাবা রয়েছেন।
### তিন দশকের আইনি লড়াই
সালমান শাহর মৃত্যুর পর ১৯৯৬ সালে তার বাবা প্রয়াত কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী অপমৃত্যুর মামলা করেন। পরের বছর ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে অভিযোগ করে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন জানান তিনি।
১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর সিআইডি তদন্ত শেষে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। সেখানে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করা হয়। তবে ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে রিভিশন মামলা করেন তার বাবা।
এরপর ২০০৩ সালে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। দীর্ঘ ১১ বছর পর ২০১৪ সালে সেই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল হয়। সেখানেও হত্যার অভিযোগ নাকচ করা হয়।
বাবার মৃত্যুর পর মামলাটি চালিয়ে যান সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী। ২০১৫ সালে তিনি বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনে নারাজি দিয়ে ১১ জনের বিরুদ্ধে হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগ তোলেন।
পরে তদন্তের দায়িত্ব যায় র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) কাছে। তবে রাষ্ট্রপক্ষের আপত্তির পর ২০১৬ সালে আদালত র্যাবকে তদন্ত থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। এরপর তদন্তভার পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
চার বছর তদন্তের পর ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে পিবিআই আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। সেখানেও সালমান শাহকে হত্যার অভিযোগের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়। পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে পারিবারিক কলহ ও মানসিক যন্ত্রণাকে আত্মহত্যার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
### ফের হত্যা মামলা
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ বাদীপক্ষের করা পুনর্বিবেচনার আবেদন মঞ্জুর করে মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। এর পরদিন রমনা থানায় নতুন করে মামলা করেন সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম।
মামলায় সামীরা হকসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন শিল্পপতি ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, লতিফা হক লুছি, আশরাফুল হক ডন, ডেবিট, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার সৌন্দর্যকেন্দ্রের রুবি, আব্দুস ছাত্তার, সাজু ও রেজভি আহমেদ ফরহাদ। মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় আরও কয়েকজনকেও আসামি করা হয়েছে।
ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে আদালতের অনুমতি নিয়ে গত মে মাসে সালমান শাহর মরদেহ কবর থেকে উত্তোলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে বাদীপক্ষ ওই আদেশ বাতিলের আবেদন করায় বিষয়টি বর্তমানে আদালতে রয়েছে।
সিআইডি জানিয়েছে, মামলার তদন্ত চলছে এবং বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বাদীপক্ষের আইনজীবীর প্রত্যাশা, আসামিদের গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে এবং দীর্ঘদিনের রহস্যের জট খুলতে পারে।
তবে তিনটি পৃথক তদন্তে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত এবং বর্তমানে হত্যা মামলায় নতুন তদন্ত—দুই ভিন্ন অবস্থানের মধ্যেই তিন দশক ধরে আটকে আছে সালমান শাহর মৃত্যুর রহস্য। নতুন তদন্ত শেষ হলে সেই বহুল আলোচিত প্রশ্নের উত্তর মিলবে কি না, এখন সেদিকেই তাকিয়ে তার পরিবার, ভক্ত ও চলচ্চিত্রাঙ্গন।






