অ্যাটোরভাস্ট্যাটিন কি হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমায়

অস্ট্রেলিয়ার STAREE গবেষণায় বয়স্কদের হৃদরোগের ঘটনা কমার প্রমাণ; তবে ৩০ শতাংশ কমার তথ্যটি মূলত সম্মিলিত হৃদরোগজনিত ঘটনার।
স্বাস্থ্য ডেস্ক: অস্ট্রেলিয়ার একটি বড় গবেষণার বরাত দিয়ে যুগান্তরের খবরে বলা হয়েছে, উচ্চঝুঁকির বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ অ্যাটোরভাস্ট্যাটিন হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি প্রায় ৩০ শতাংশ কমাতে পারে। তথ্যটি মূলত সঠিক। তবে গবেষণার ফলাফলটি আরও নির্ভুলভাবে ব্যাখ্যা করলে দেখা যায়, ৩০ শতাংশ কমার বিষয়টি মূলত হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, হৃদরোগজনিত মৃত্যু ও করোনারি রিভাসকুলারাইজেশন—এই সম্মিলিত প্রধান ফলাফলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
গবেষণায় কী পাওয়া গেছে
গবেষণাটির নাম STAREE—STAtins in Reducing Events in the Elderly। অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণার ফলাফল নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে ২৮ আগস্ট ২০২৬ প্রকাশিত হয়। একই দিনে ইউরোপিয়ান সোসাইটি অব কার্ডিওলজি কংগ্রেসেও গবেষণার ফল উপস্থাপন করা হয়।
গবেষণায় অংশ নেন মোট ৯ হাজার ৯৭১ জন। তাদের বয়স ছিল ৭০ বছর বা তার বেশি; গড় বয়স ৭৪ দশমিক ৭ বছর। অংশগ্রহণকারীদের ৫১ দশমিক ৯ শতাংশ নারী। তারা সবাই শুরুতে সুস্থ ছিলেন—অর্থাৎ কারও পরিচিত হৃদরোগ, ডায়াবেটিস বা ডিমেনশিয়া ছিল না।
অংশগ্রহণকারীদের একদল প্রতিদিন ৪০ মিলিগ্রাম অ্যাটোরভাস্ট্যাটিন এবং অন্যদল প্ল্যাসিবো গ্রহণ করেন। গড়ে ৫ দশমিক ৯ বছর তাদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়।
৩০ শতাংশ কমেছে কোন ঝুঁকি
গবেষণায় দেখা যায়, অ্যাটোরভাস্ট্যাটিন গ্রহণকারী দলের প্রধান কার্ডিওভাসকুলার ঘটনাগুলো প্রায় ৩০ শতাংশ কম হয়েছে। এর হার্ডার্ড রেশিও ছিল ০ দশমিক ৭০।
এই প্রধান ফলাফলের মধ্যে ছিল—হার্ট অ্যাটাক; স্ট্রোক; কার্ডিওভাসকুলার কারণে মৃত্যু; করোনারি রিভাসকুলারাইজেশন।
তবে নন-ফ্যাটাল মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন বা হার্ট অ্যাটাকের ঘটনা আলাদাভাবে বিবেচনা করলে কমার হার ছিল আরও বেশি—প্রায় ৪৩ শতাংশ।
অন্যদিকে ডিসএবিলিটি-ফ্রি সারভাইভাল—অর্থাৎ মৃত্যু, ডিমেনশিয়া বা স্থায়ী শারীরিক অক্ষমতামুক্ত জীবন—অ্যাটোরভাস্ট্যাটিন গ্রহণে বাড়েনি।
অতএব, যুগান্তরের প্রতিবেদনে ‘হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি প্রায় ৩০ শতাংশ কম’ বলা পুরোপুরি ভুল নয়। তবে গবেষণার ভাষায় আরও নির্ভুল বক্তব্য হবে—প্রধান হৃদরোগ-সম্পর্কিত সম্মিলিত ঘটনা ৩০ শতাংশ কমেছে, আর নন-ফ্যাটাল হার্ট অ্যাটাক কমেছে প্রায় ৪৩ শতাংশ।
অ্যাটোরভাস্ট্যাটিন কীভাবে কাজ করে
অ্যাটোরভাস্ট্যাটিন স্ট্যাটিন শ্রেণির একটি ওষুধ। এটি লিভারে কোলেস্টেরল তৈরির প্রক্রিয়ায় বাধা দিয়ে রক্তে এলডিএল বা ‘খারাপ’ কোলেস্টেরল কমায়।
এতে ধমনিতে কোলেস্টেরল ও চর্বিজাতীয় পদার্থের প্লাক জমার সম্ভাবনা কমে এবং বিদ্যমান প্লাক স্থিতিশীল হতে পারে। এর ফলে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।
কারা বেশি উপকৃত হতে পারেন
গবেষণার ফল অনুযায়ী বিশেষ করে ৭০ বছরের বেশি বয়সী, উচ্চ কোলেস্টেরল বা উচ্চ রক্তচাপসহ অন্যান্য হৃদরোগের ঝুঁকি রয়েছে, কিন্তু এখনো হৃদরোগ ধরা পড়েনি—এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে স্ট্যাটিনের উপকারিতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ৭০ বছরের বেশি বয়সী প্রত্যেক ব্যক্তিকে স্ট্যাটিন খেতে হবে। চিকিৎসক ব্যক্তির সামগ্রিক হৃদরোগের ঝুঁকি, লিভারের কার্যকারিতা, পেশির সমস্যা এবং অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে ওষুধ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কতটা
গবেষণায় অ্যাটোরভাস্ট্যাটিন গ্রহণকারীদের মধ্যে পেশিতে ব্যথা, লিভার এনজাইম বেড়ে যাওয়া এবং ডায়াবেটিস-সম্পর্কিত কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সামান্য বেশি দেখা গেছে।
তবে গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার হার দুই দলের মধ্যে প্রায় একই ছিল—প্রায় ২ দশমিক ৭ শতাংশ।
তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজের ইচ্ছায় অ্যাটোরভাস্ট্যাটিন শুরু করা বা বন্ধ করা উচিত নয়।
শুধু ওষুধই সমাধান নয়
গবেষকেরাও হৃদরোগ প্রতিরোধে ওষুধের পাশাপাশি জীবনযাত্রার পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে—বেশি ফল ও সবজি খাওয়া; নিয়মিত ব্যায়াম করা; ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা; ধূমপান ত্যাগ করা; পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা।
STAREE গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স্ক সুস্থ ব্যক্তিদের মধ্যে অ্যাটোরভাস্ট্যাটিন গ্রহণে প্রধান কার্ডিওভাসকুলার ঘটনাগুলো প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে এবং নন-ফ্যাটাল হার্ট অ্যাটাক আরও বেশি কমেছে। একই সঙ্গে দেখা গেছে, এটি মৃত্যু, ডিমেনশিয়া বা স্থায়ী শারীরিক অক্ষমতামুক্ত জীবন বাড়ায়নি।
ফলে অ্যাটোরভাস্ট্যাটিনকে ‘জাদু ওষুধ’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি কার জন্য উপকারী হবে, কত মাত্রায় এবং কতদিন ব্যবহার করা হবে—তা ব্যক্তির স্বাস্থ্যঝুঁকি ও চিকিৎসকের মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করে।
সুতরাং, গবেষণাটি বয়স্কদের হৃদরোগের প্রাথমিক প্রতিরোধে স্ট্যাটিনের সম্ভাব্য উপকারিতার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ দিয়েছে; কিন্তু গবেষণার ফল দেখে নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ শুরু বা বন্ধ করা নিরাপদ নয়।






