নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ার বার্তা সেনাপ্রধানের

আমদানি নয়, প্রযুক্তি আয়ত্তে প্রতিরক্ষা শিল্পে আত্মনির্ভরতার পথে বাংলাদেশ। ভাটিয়ারীতে ৫৪.৯৯ একর জমিতে নতুন সমরাস্ত্র কারখানা, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও রপ্তানির ওপর জোর।

নিজস্ব প্রতিবেদক: শুধু বিদেশ থেকে অস্ত্র কিনে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ধরে রাখা সম্ভব নয়—এমন বাস্তবতা সামনে রেখে দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পকে শক্তিশালী করার ওপর জোর দিয়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর কাছ থেকে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সহযোগিতা নিয়ে স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে প্রতিরক্ষা পণ্য রপ্তানির লক্ষ্যও সামনে এসেছে।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট ২০২৬) চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারীতে জলিল টেক্সটাইল মিলসের জমি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর অনুষ্ঠানে সেনাপ্রধান এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনের (বিটিএমসি) অধীনে থাকা প্রায় ৫৪ দশমিক ৯৯ একর জমি প্রতীকী মূল্যে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এই জমিতে বাংলাদেশ অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরিজের (বিওএফ) দ্বিতীয় আধুনিক সমরাস্ত্র ও গোলাবারুদ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।

বর্তমানে গাজীপুরে বিওএফের প্রধান কারখানা রয়েছে। ভাটিয়ারীর নতুন উৎপাদনকেন্দ্র চালু হলে সেনাবাহিনীর পাশাপাশি বাংলাদেশ নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, পুলিশ, আনসার ও অন্যান্য আধা-সামরিক বাহিনীর প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও গোলাবারুদ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়বে।

আমদানিনির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য

সেনাপ্রধানের বক্তব্যের মূল সুর হলো প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় শুধু আমদানির ওপর নির্ভর না করে নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করা। এর জন্য প্রয়োজন আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল, গবেষণা এবং বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর সঙ্গে কার্যকর প্রযুক্তি বিনিময়।

তিনি মনে করেন, স্থানীয়ভাবে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে একদিকে আমদানির ওপর চাপ কমবে, অন্যদিকে সংকটকালীন সময়ে বিদেশি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিও কমানো সম্ভব হবে।

প্রতিরক্ষা শিল্পকে শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে রপ্তানিমুখী করার লক্ষ্যও রয়েছে। উৎপাদন সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে প্রতিরক্ষা পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ভাটিয়ারী কেন গুরুত্বপূর্ণ

নতুন কারখানার জন্য ভাটিয়ারীকে বেছে নেওয়ার পেছনে ভৌগোলিক ও কৌশলগত কিছু সুবিধা রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের কাছাকাছি হওয়ায় ভবিষ্যতে পণ্য পরিবহন ও রপ্তানি কার্যক্রমে সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি বিস্ফোরক ও গোলাবারুদ উৎপাদনের মতো সংবেদনশীল শিল্প স্থাপনে তুলনামূলক নিরাপত্তা সুবিধা দিতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

প্রযুক্তি হস্তান্তর হবে বড় চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম আমদানি করে আসছে। চীন, তুরস্ক, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা রয়েছে। তবে আধুনিক প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তুলতে শুধু অস্ত্র কেনা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন প্রযুক্তি আয়ত্ত করা এবং স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করা।
এক্ষেত্রে প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিদেশি প্রযুক্তি স্থানীয় শিল্পে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হলে প্রকৌশলী ও কারিগরি জনবলকে দক্ষ করে তোলা, গবেষণা সক্ষমতা বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ অবকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন।

রপ্তানির সম্ভাবনা

বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরও প্রতিরক্ষা শিল্পকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও উৎপাদনমুখী করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পর উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে প্রতিরক্ষা পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বিধিবিধান, প্রযুক্তিগত মান, বাজার সক্ষমতা এবং কূটনৈতিক বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে।

ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন গুরুত্ব

বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামরিক প্রতিযোগিতা বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে কোনো দেশের প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের সরবরাহ যদি অতিরিক্তভাবে বিদেশি উৎসের ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে যুদ্ধ বা আন্তর্জাতিক সংকটের সময় সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা একটি দেশের কৌশলগত নিরাপত্তার অংশ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। অস্ত্র ও গোলাবারুদের পাশাপাশি ভবিষ্যতে ড্রোন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, সামরিক যান ও অন্যান্য প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে স্থানীয় সক্ষমতা বাড়ানো হলে সামগ্রিক প্রতিরক্ষা শিল্পের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হতে পারে।

সামনে যে কাজগুলো গুরুত্বপূর্ণ

দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পকে বাস্তব অর্থে আত্মনির্ভরশীল করতে নতুন কারখানা স্থাপনের পাশাপাশি গবেষণা ও উন্নয়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষ জনবল তৈরি এবং বেসরকারি শিল্পখাতের অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন।

একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা শিল্প নীতিমালা, সম্ভাব্য ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন এবং বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর সঙ্গে যৌথ উৎপাদন ও প্রযুক্তি সহযোগিতার কাঠামো কার্যকর করা হলে এই খাত আরও দ্রুত এগিয়ে যেতে পারে।

নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত

ভাটিয়ারীতে নতুন সমরাস্ত্র ও গোলাবারুদ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ এবং সেনাপ্রধানের বক্তব্য বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—লক্ষ্য শুধু অস্ত্র কেনা নয়, বরং ধীরে ধীরে প্রযুক্তি আয়ত্ত করে নিজেদের উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করা।

সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এই উদ্যোগ একদিকে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও কৌশলগত স্বাধীনতা বাড়াতে পারে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে একটি আধুনিক ও রপ্তানিমুখী প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলার পথও তৈরি করতে পারে।