খেলাপি ঋণ আদায়ে একীভূত ৫ ব্যাংকের ১০ হাজার মামলা

আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় আইনি পদক্ষেপ, চলছে আরও মামলা; ঋণ জালিয়াতির ফরেনসিক অডিটও চূড়ান্ত পর্যায়ে।

নিজস্ব প্রতিবেদক: খেলাপি ঋণ আদায় ও ব্যাংকের আটকে থাকা অর্থ উদ্ধারে একীভূত পাঁচ ইসলামী ব্যাংক প্রায় ১০ হাজার মামলা করেছে। আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং দীর্ঘদিন আটকে থাকা ঋণের অর্থ ফেরত আনতেই এসব মামলা করা হয়েছে। একই সঙ্গে আরও মামলা দায়েরের প্রক্রিয়াও চলছে।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে ব্যাংক রেজল্যুশন ডিপার্টমেন্টের (বিআরডি) এক সভায় ঋণ আদায় ও পুনর্গঠন কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনায় এ তথ্য উঠে আসে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

সভায় পাঁচ ব্যাংককে একীভূত করে পুনর্গঠন, পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা পুনর্গঠন, মানবসম্পদ সমন্বয়, শাখা একীভূতকরণ এবং তথ্যপ্রযুক্তি ও পরিচালন কার্যক্রম সমন্বয়ের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়।

খেলাপি ঋণ আদায়ে শুধু প্রচলিত আইনি ব্যবস্থা নয়, সমঝোতাভিত্তিক বিকল্প ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে এক্সিট পলিসি ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা এডিআরের মাধ্যমে দ্রুত ঋণ আদায় এবং বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, আগের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার সময়ে সংঘটিত অনিয়ম, দুর্নীতি, ঋণ জালিয়াতি এবং সম্পদ অপব্যবহারের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে পরিচালিত ফরেনসিক অডিটও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এর মাধ্যমে অনিয়মের প্রকৃত চিত্র এবং দায়ীদের শনাক্ত করার পথ আরও পরিষ্কার হবে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পুনর্গঠনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। স্বতন্ত্র পরিচালকদের প্রাধান্য দিয়ে পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে। গত ১৬ জুলাই ব্যাংকটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

প্রায় ১৬ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদমর্যাদা, দায়িত্ব ও সাংগঠনিক কাঠামো প্রয়োজন অনুযায়ী সমন্বয়ের কাজ চূড়ান্ত করা হয়েছে। পাঁচ ব্যাংকের কার্যক্রমকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনতে কোর ব্যাংকিং সিস্টেম (সিবিএস), সুইফট ও আরএমএসহ তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো একীভূত করার কাজও এগিয়ে চলছে।

আমানতকারীদের সুবিধায় পাঁচ ব্যাংকের যেকোনো শাখা থেকে আমানতের অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দিতে একটি কমন ইন্টারফেস চালুর কাজও সম্পন্ন হয়েছে।

এদিকে ব্যাংকের শাখার অবস্থান, ব্যবসায়িক সম্ভাবনা, গ্রাহকসেবা ও পরিচালন ব্যয় বিবেচনায় ৭৮০টি শাখা এবং ১ হাজার ৫০০টি ব্যবসায়িক ইউনিটের একীভূতকরণ ও পুনর্বিন্যাসের কাজ চলছে। এর ফলে অপ্রয়োজনীয় পরিচালন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি সেবার সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পুনর্গঠন, ঋণ আদায়, মামলা নিষ্পত্তি, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, শাখা ও ব্যবসায়িক ইউনিট একীভূতকরণ এবং প্রযুক্তিগত সমন্বয়ের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করছে বিআরডি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যাশা, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে ব্যাংকটির সুশাসন ও পরিচালন দক্ষতা বাড়বে, খেলাপি ঋণ আদায় ত্বরান্বিত হবে এবং পরিচালন ব্যয় কমবে। একই সঙ্গে ব্যাংকে আটকে থাকা অর্থ উৎপাদনশীল খাতে পুনঃপ্রবাহিত করার সুযোগ তৈরি হবে।

পাঁচ ব্যাংকের একীভূতকরণের পর প্রায় ১০ হাজার মামলা দায়েরের তথ্য শুধু ঋণ আদায়ের তৎপরতাই নয়, ব্যাংক খাতে পুরোনো অনিয়ম ও ঋণ জালিয়াতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে মামলা দায়েরের পাশাপাশি দ্রুত নিষ্পত্তি, সম্পদ উদ্ধারে কার্যকর ব্যবস্থা এবং প্রকৃত দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা—এই তিনটি বিষয়ই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।