মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে যোগদানের আমন্ত্রণ বাংলাদেশের সামনে নতুন কূটনৈতিক পরীক্ষা

সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে ইতিবাচক ঢাকা; ভারতের সঙ্গে সম্পর্কসহ আঞ্চলিক ভারসাম্যে সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে সতর্ক বিশ্লেষকদের।

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশকে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ঢাকার পক্ষ থেকে প্রস্তাবটিকে ইতিবাচকভাবে দেখা হলেও কোনো সামরিক জোটে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হলে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রশ্ন উঠতে পারে।

বিশেষ করে প্রতিবেশী ভারতসহ চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশের জুনিয়র পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামি দেশগুলোর মধ্যে কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে উঠলে তাতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বিবেচনা করা অস্বাভাবিক নয়। বিষয়টি ইতিবাচকভাবেই দেখা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশের নেতৃত্বকে, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে, এ উদ্যোগে অংশ নেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, সৌদি আরব ঢাকাকে ওই চুক্তিতে যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তবে কখন এ আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, তা সূত্রটি জানায়নি। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে সূত্রটি গণমাধ্যমকে এ তথ্য দেয়।

কী এই মক্কা চুক্তি

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান চলতি আগস্টে পবিত্র মক্কা নগরীতে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করে। চুক্তিটির কাঠামো অনেকটা ন্যাটোর সমষ্টিগত প্রতিরক্ষা নীতির আদলে তৈরি। এর মূল ধারণা হলো—এক সদস্য রাষ্ট্রের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনা ও সংঘাতের প্রেক্ষাপটে তিন দেশের মধ্যে এ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার হয়েছে। তুরস্কের রয়েছে ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনী, পাকিস্তান পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র এবং সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল রপ্তানিকারক দেশ।

তুরস্ক ইতোমধ্যে জানিয়েছে, চুক্তিটি ভবিষ্যতে অন্য দেশগুলোর জন্যও উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।

ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতিতে বড় পরীক্ষা

বাংলাদেশ ঐতিহ্যগতভাবে বিভিন্ন পরাশক্তি ও আঞ্চলিক শক্তির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করে আসছে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, রপ্তানি, শ্রমবাজার ও কৌশলগত স্বার্থের কারণে একই সঙ্গে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখা ঢাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

এ অবস্থায় কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক জোটে যুক্ত হওয়া বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিকভাবে নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক কল্লোল কিবরিয়ার মতে, কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক জোটে যোগ দিলে শুধু ভারতের সঙ্গে নয়, চীন, ইরান, জাপান, কুয়েত, ওমান, কাতার, রাশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও বাংলাদেশের সম্পর্কের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে বাড়তি সংবেদনশীলতা

মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের বিষয়টি ভারতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কে বিভিন্ন ইস্যুতে টানাপোড়েন রয়েছে। সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় বাহিনীর লোকজনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ এবং ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার দাবি—দুই দেশের সম্পর্কে নতুন সংবেদনশীলতা তৈরি করেছে।

এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামোয় যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে তা ভারতের কৌশলগত হিসাবেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

অর্থনীতিও বড় বিবেচনা

বাংলাদেশের সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক স্বার্থও গুরুত্বপূর্ণ। দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির বড় বাজার যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত লাখ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসীর পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস।

ফলে কোনো সামরিক জোটে যুক্ত হয়ে একটি নির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক বলয়ে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট হলে তার অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়াও বিবেচনায় নিতে হবে।

তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এখনো চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি। আমন্ত্রণকে ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হলেও সম্ভাব্য নিরাপত্তা, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়ন করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি সামনে রয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ এখন—নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর সুযোগ কাজে লাগানো, নাকি দীর্ঘদিনের ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান অক্ষুণ্ন রাখা।

মক্কা চুক্তিতে ঢাকার সম্ভাব্য অংশগ্রহণ সেই কৌশলগত সিদ্ধান্তেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।