৩৬ জুলাইয়ের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আজ, গণতন্ত্রের নতুন বার্তা: শপথ শুক্রবার

৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে জাতীয় সংসদে ভোটের আয়োজন; মির্জা ফখরুল ও ড. অলি আহমদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ফলের অপেক্ষায় রাজনৈতিক অঙ্গন।

টুইট প্রতিবেদক: দীর্ঘ ৩৫ বছর পর দেশে রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে বেলা ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ৩৪৯ জন সংসদ সদস্যের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হবেন দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি। এবারের নির্বাচনে বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী ড. অলি আহমদ বীরবিক্রম।

দীর্ঘ বিরতির পর রাষ্ট্রপতি পদে ভোটের মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হওয়াকে দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। রাষ্ট্রপতি পদ সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদগুলোর একটি। ফলে সংসদ সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে প্রার্থী বাছাই ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর ভূমিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মির্জা ফখরুল

এবারের নির্বাচনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রার্থিতা বিএনপির জন্য বিশেষ রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সংসদীয় রাজনীতি ও দল পরিচালনায় তার ভূমিকার কারণে রাষ্ট্রপতি পদে তার প্রার্থিতাকে বিএনপি একটি দায়িত্বশীল ও অভিজ্ঞ নেতৃত্বের প্রতিফলন হিসেবে তুলে ধরছে।

বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর সমর্থন মির্জা ফখরুলের প্রার্থিতাকে নির্বাচনে শক্ত অবস্থান দিয়েছে। অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ড. অলি আহমদ বীরবিক্রমের অংশগ্রহণ নির্বাচনকে প্রতিযোগিতামূলক করেছে। ফলে ফলাফল যাই হোক, এবারের নির্বাচন রাষ্ট্রপতি পদকে কেন্দ্র করে একটি দৃশ্যমান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ তৈরি করেছে।

৩৫ বছর পর ভোটের আয়োজন

১৯৯১ সালের পর প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর আগে বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রপতি পদে একক প্রার্থী থাকায় ভোট গ্রহণের প্রয়োজন হয়নি। সেই অর্থে এবারের নির্বাচন শুধু একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং সংসদীয় ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে একজন ব্যক্তিকে নির্বাচিত করার প্রক্রিয়াকে আবারও দৃশ্যমান করেছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মতের বৈচিত্র্য ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের একটি ইতিবাচক দিক। সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ রাজনৈতিক অবস্থান ও বিবেচনা অনুযায়ী ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন—এটিও সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি সম্পন্ন

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসিরউদ্দিন জানিয়েছেন, ভোটগ্রহণের সময় কোনো ধরনের প্রচার চালানো যাবে না। ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক কোনো সমস্যা দেখা দিলে চিফ হুইপ ও বিরোধী দলের চিফ হুইপের সহায়তা নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।

সংসদ কক্ষে প্রবেশের সময় প্রত্যেক সংসদ সদস্যকে সংসদ সচিবালয় থেকে দেওয়া পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখতে হবে। নিজ আসনে বসার পর সহায়তাকারী কর্মকর্তার কাছ থেকে নাম ও বিভক্তি নম্বরসংবলিত ব্যালট পেপার সংগ্রহ করতে হবে।

ব্যালটের নির্ধারিত অংশে প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ করে তা কর্মকর্তার কাছে ফেরত দিতে হবে। কোনো কারণে ব্যালট পেপার নষ্ট হলে সেটি ব্যালট বাক্সে না দিয়ে নির্বাচনকর্তার কাছে উপস্থাপন করতে হবে। তিনি বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।

বিকেলেই ফল ঘোষণা

বিকেল ৫টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পরপরই গণনা শুরু হবে। গণনা শেষে যে প্রার্থী সর্বাধিক বৈধ ভোট পাবেন, নির্বাচনকর্তা তাকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত ঘোষণা করবেন। পরে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করা হবে।

নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ঐতিহাসিক এ নির্বাচন সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্যভাবে সম্পন্ন করতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। কমিশনের এই প্রস্তুতি এবং ভোটগ্রহণের নিয়মতান্ত্রিক আয়োজন নির্বাচনটির গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে।

কাল বঙ্গভবনে শপথ

নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থী আগামীকাল শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেবেন। জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ও স্পিকারের দায়িত্বে থাকা ব্যারিস্টার কায়সার কামাল নতুন রাষ্ট্রপতিকে শপথ বাক্য পাঠ করাবেন।

শপথ অনুষ্ঠানের পর রেওয়াজ অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন রাষ্ট্রপতির কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করবেন।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে এরই মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আয়োজন হওয়ায় এ নির্বাচন দেশের সাংবিধানিক ও সংসদীয় ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হিসেবে যুক্ত হতে যাচ্ছে।

রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সংসদ সদস্যদের ভোটাধিকার প্রয়োগ এবং নির্ধারিত সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা হস্তান্তরের এই আয়োজন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে দলটির দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার প্রতি অঙ্গীকারও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

সব মিলিয়ে, এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শুধু একজন নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া নয়; বরং দীর্ঘ বিরতির পর প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভোট প্রয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক অনুশীলন।