পাহাড়ে দীপেনের শূন্যতা পূরণ হচ্ছে কি সাচিং প্রু জেরীকে দিয়ে

বঙ্গভবনে প্রস্তুতি, নতুন রাষ্ট্রপতির কাছেই শপথ নেবেন কি সাচিং প্রু জেরী।
বান্দরবান/ঢাকা থেকে বিশেষ প্রতিবেদন: প্রায় দুই মাস ধরে শূন্য থাকা পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নতুন করে বণ্টনের প্রস্তুতি চলছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের সূত্রের দাবি, বান্দরবান থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও বোমাং রাজপরিবারের সন্তান সাচিং প্রু জেরীকে এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে।
একই সময়ে গাইবান্ধা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকনকে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী করার সিদ্ধান্তও চূড়ান্ত হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
সূত্রের ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন না এলেও নতুন করে দুজনকে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সাচিং প্রু জেরীকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং শামীম কায়সার লিংকনকে ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। আগামী ২০ আগস্ট এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে বলেও সূত্রটি জানিয়েছে।
তবে নিয়োগের বিষয়ে সাচিং প্রু জেরীর নিজের বক্তব্য ভিন্ন। সম্ভাব্য মন্ত্রী হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি সম্পর্কে ‘কিছুই জানা নেই’ বলে জানিয়েছেন। ফলে সরকারি প্রজ্ঞাপন বা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত তাঁর নিয়োগকে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের পর শূন্যতা
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে এর আগে ছিলেন রাঙামাটি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান। শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তিনি গত ১ জুন পদত্যাগ করেন। তাঁর পদত্যাগের পর মন্ত্রণালয়টির দায়িত্বে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়।
দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের পর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের পাশাপাশি ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন। ফলে একই ব্যক্তির ওপর দুটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থাকায় পার্বত্য মন্ত্রণালয়ে নতুন নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়টি সামনে আসে।
প্রায় দুই মাস পর সেই শূন্যতা পূরণে বান্দরবান থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য সাচিং প্রু জেরীর নাম সামনে এসেছে।
কেন আলোচনায় সাচিং প্রু জেরী
সাচিং প্রু জেরী বান্দরবানের বোমাং সার্কেলের রাজপরিবারের সন্তান এবং বোমাং রাজপুত্র হিসেবে পরিচিত। ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বান্দরবান আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে তিনি জাতীয় সংসদে ফিরে আসেন।
তাঁর পারিবারিক পরিচয়ও পার্বত্য রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর বাবা বান্দরবানের ১৫তম বোমাং রাজা উং শৈ প্রু চৌধুরী ছিলেন বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করেছিলেন। উং শৈ প্রু চৌধুরী ১৯৯৬ সালেও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
ফলে বোমাং রাজপরিবারের উত্তরসূরি হিসেবে সাচিং প্রু জেরীর রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিচিতি পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতিতে আলাদা গুরুত্ব বহন করে।
পাহাড়ে বিশেষ বার্তার ইঙ্গিত
সংশ্লিষ্টদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে বান্দরবান থেকে নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্যকে আনার সিদ্ধান্ত পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম দীর্ঘদিন ধরেই ভূমি, আঞ্চলিক প্রশাসন, উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, পর্যটন, যোগাযোগ ও বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর পারস্পরিক সম্পর্কসহ নানা বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
এ অবস্থায় পার্বত্য অঞ্চলের একজন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিকে সরাসরি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সরকারের যোগাযোগ আরও ঘনিষ্ঠ হতে পারে—এমন প্রত্যাশা রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলে।
তবে নতুন দায়িত্ব পেলে সাচিং প্রু জেরী এসব প্রত্যাশা কতটা বাস্তবায়ন করতে পারেন, সেটিই হবে বড় প্রশ্ন।
পানির সংকট ও কর্মসংস্থান নিয়ে গুরুত্ব
সাচিং প্রু জেরী বিভিন্ন সময় পার্বত্য অঞ্চলের পানির সংকট, কর্মসংস্থান, পর্যটন এবং সামাজিক সম্প্রীতির বিষয়ে কথা বলেছেন। বিশেষ করে বান্দরবানের সম্ভাবনাময় ইকো-ট্যুরিজম খাতকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান তৈরির বিষয়টি তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে।
নতুন দায়িত্ব পেলে পাহাড়ের মানুষের জন্য নিরাপদ পানি, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পর্যটন অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সম্প্রীতি বজায় রাখার মতো বিষয়গুলো তাঁর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
১৯৯৮ সালে গঠিত হয় পার্বত্য মন্ত্রণালয়
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ১৯৯৮ সালে গঠিত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির পর তিন পার্বত্য জেলা—বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের সমন্বয়ে এ মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
আঞ্চলিক পরিষদ, পার্বত্য জেলা পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের সঙ্গে মন্ত্রণালয়টি সরাসরি সম্পৃক্ত।
ফলে মন্ত্রণালয়টির নেতৃত্ব শুধু একটি প্রশাসনিক পদ নয়; পাহাড়ের উন্নয়ন, শান্তি, সম্প্রীতি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সরকারের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি
এদিকে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে বঙ্গভবনেও প্রস্তুতি চলছে। বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ২১ আগস্ট শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টায় বঙ্গভবনের দরবার হলে নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রস্তুতি রয়েছে।
রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মো. সরওয়ার আলম এর আগে জানিয়েছিলেন, রাষ্ট্রপতির শপথের জন্য বঙ্গভবনে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে এবং ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পর শপথ অনুষ্ঠানের সময় জানানো হবে।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের সূত্রের দাবি, সাচিং প্রু জেরী ও শামীম কায়সার লিংকনের শপথও নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণের পরপরই অনুষ্ঠিত হতে পারে। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন বা সরকারি ঘোষণা না আসা পর্যন্ত সময়সূচি চূড়ান্ত বলে ধরা যাচ্ছে না।
এখন অপেক্ষা আনুষ্ঠানিক ঘোষণার
একদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের শূন্যতা, অন্যদিকে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া—দুটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ঘটনাকে ঘিরে এখন ঢাকার রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে।
সাচিং প্রু জেরী সত্যিই পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাচ্ছেন কি না, শামীম কায়সার লিংকন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী হচ্ছেন কি না এবং তাঁদের শপথের সময়সূচি কী হবে—এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর মিলবে সরকারি প্রজ্ঞাপন ও আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমে।
তবে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সূত্রের দাবি সত্য হলে, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে এবার আসতে যাচ্ছেন পাহাড়েরই একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। বোমাং রাজপরিবারের উত্তরসূরি হিসেবে সাচিং প্রু জেরীর এই সম্ভাব্য নিয়োগ তাই প্রশাসনিক পরিবর্তনের পাশাপাশি পাহাড়ের রাজনীতি ও সরকারের সঙ্গে পার্বত্য জনগোষ্ঠীর সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।






