পাঁচ বছরে গ্যাস উৎপাদন কমেছে ৩০ শতাংশ

চাহিদা বাড়লেও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে দেশীয় মজুত; বাড়ছে এলএনজি আমদানিনির্ভরতা, ২০৩১ সালের পর বড় সংকটের আশঙ্কা
টুইট ডেস্ক: দেশে গ্যাসের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। বিপরীতে কমছে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ও উত্তোলনযোগ্য মজুত। ফলে বাড়তি চাহিদা মেটাতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের আমদানিনির্ভরতা বাড়ছে। পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, পাঁচ বছরে দেশের গ্যাস উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে। একই সঙ্গে অধিকাংশ বড় গ্যাসক্ষেত্রের মজুতও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে দৈনিক গড়ে ১ হাজার ৬৫৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হতো। ওই বছর দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানা থেকে উৎপাদন ছিল ১ হাজার ৩০১ মিলিয়ন ঘনফুট। তিতাসে ৪৪৩, জালালাবাদে ২৩৬ এবং হবিগঞ্জে ১৮৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হতো।
এরপর ধীরে ধীরে উৎপাদন কমতে থাকে। ২০২১ সালে দৈনিক উৎপাদন নেমে আসে ১ হাজার ৬৩০ মিলিয়ন ঘনফুটে। ২০২২ সালে তা আরও কমে ১ হাজার ৪৩৬ মিলিয়ন, ২০২৩ সালে ১ হাজার ৩১১ মিলিয়ন এবং ২০২৪ সালে ১ হাজার ২৫৮ মিলিয়ন ঘনফুটে দাঁড়ায়।
সর্বশেষ ২০২৫ সালে দেশের গ্যাস উৎপাদন নেমে আসে দৈনিক ১ হাজার ১৬৮ মিলিয়ন ঘনফুটে। অর্থাৎ পাঁচ বছরে দৈনিক উৎপাদন কমেছে প্রায় ৪৮৮ মিলিয়ন ঘনফুট বা প্রায় ৩০ শতাংশ।
বড় ক্ষেত্রগুলোতেও কমছে উৎপাদন
দেশের প্রধান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদনেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ২০২০ সালে বিবিয়ানা থেকে দৈনিক ১ হাজার ৩০১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হলেও ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৯৭২ মিলিয়ন ঘনফুটে।
একই সময়ে তিতাসে উৎপাদন ৪৪৩ থেকে ৩৪৪ মিলিয়ন, হবিগঞ্জে ১৮৭ থেকে ১০৮ মিলিয়ন এবং জালালাবাদে ২৩৬ থেকে ১৪৫ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে।
চলতি বছর পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, গত ১৬ আগস্ট দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে মাত্র ৯০৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে। এর মধ্যে বিবিয়ানা থেকে এসেছে ৭৪০ মিলিয়ন এবং জালালাবাদ থেকে ১২২ মিলিয়ন ঘনফুট।
২০২০ সালের তুলনায় বিবিয়ানার দৈনিক উৎপাদনই কমেছে প্রায় ৫৬১ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে দেশের গ্যাস সরবরাহে বড় ক্ষেত্রগুলোর ওপর নির্ভরতা ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ঘাটতি পূরণে বাড়ছে এলএনজি
দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় চাহিদা মেটাতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি বাড়িয়েছে সরকার। বর্তমানে দেশে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে দৈনিক প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে।
২০২০ সালে এলএনজি সরবরাহের পরিমাণ ছিল দৈনিক গড়ে ৫০৬ মিলিয়ন ঘনফুট। ২০২১ সালে তা বেড়ে ৯০০ মিলিয়ন, ২০২২ সালে ৯২২ মিলিয়ন এবং ২০২৩ সালে ৯৭৩ মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছে।
২০২৪ সালে সরবরাহ কিছুটা কমে ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও ২০২৫ সালে তা আবার বেড়ে প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটে দাঁড়ায়।
জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশীয় গ্যাসের ঘাটতি পূরণে এলএনজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বড় চাপ তৈরি করছে।
৭৩.৮২ শতাংশ মজুত ইতিমধ্যে উত্তোলন
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মোট উত্তোলনযোগ্য মজুত ২৯ হাজার ৯২৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে ২০২৫ সাল পর্যন্ত উত্তোলন করা হয়েছে ২২ হাজার ৯১ বিলিয়ন ঘনফুট।
অর্থাৎ মোট উত্তোলনযোগ্য মজুতের ৭৩ দশমিক ৮২ শতাংশ ইতিমধ্যে ব্যবহার হয়ে গেছে। অবশিষ্ট মজুত রয়েছে প্রায় ৭ হাজার ৮৩৪ বিলিয়ন ঘনফুট।
বর্তমান হারে উৎপাদন অব্যাহত থাকলে অবশিষ্ট মজুত আরও ১০ থেকে ১১ বছর চলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সে হিসাবে ২০৩১ সালের পর বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিন ক্ষেত্রেই ৮১ শতাংশ অবশিষ্ট মজুত
বর্তমানে অবশিষ্ট গ্যাসের বড় অংশ রয়েছে মাত্র তিনটি ক্ষেত্রে-তিতাস, রশিদপুর ও কৈলাসটিলায়। এই তিন গ্যাসক্ষেত্রে অবশিষ্ট মজুতের পরিমাণ প্রায় ৬ হাজার ৩৬৭ বিলিয়ন ঘনফুট, যা মোট অবশিষ্ট মজুতের ৮১ দশমিক ২৬ শতাংশ।
এর মধ্যে রশিদপুরে ২ হাজার ৩৮২ বিলিয়ন, কৈলাসটিলায় ২ হাজার ৫৭ বিলিয়ন এবং তিতাসে ১ হাজার ৯২৮ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুত রয়েছে।
অন্যদিকে হবিগঞ্জ, শ্রীকাইল ও বেগমগঞ্জ গ্যাসক্ষেত্রের মজুত প্রায় শেষ পর্যায়ে। বিবিয়ানা ও জালালাবাদ ক্ষেত্রের মজুতও কাগজে-কলমে শেষ হয়ে গেলেও এখনো সেখান থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাস উত্তোলন হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এসব ক্ষেত্রে উৎপাদন যে কোনো সময় দ্রুত কমে যেতে পারে।
চাহিদা বাড়ছে, বাড়ছে সংকট
দেশে গ্যাসের মজুত ও উৎপাদন কমলেও চাহিদা বাড়ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৫ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। সরকারি পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে এ চাহিদা বেড়ে প্রায় ৫ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছাতে পারে।
অথচ দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর বর্তমান উৎপাদন দিয়ে এই চাহিদার ধারেকাছেও যাওয়া সম্ভব নয়। ফলে ভবিষ্যতে চাহিদা পূরণে এলএনজির ওপর নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে।
জ্বালানি খাতের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এলএনজি আমদানিতে সরকারের ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে একটি নতুন গ্যাসকূপ খননে বাপেক্সের গড়ে ব্যয় হয় প্রায় ১০০ কোটি টাকা।
নতুন অনুসন্ধানে জোর দেওয়ার তাগিদ
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় গ্যাস সরবরাহের বড় অংশ কয়েকটি পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রনির্ভর হওয়ায় উৎপাদন কমে গেলে পুরো জ্বালানি ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হবে। স্থানীয় কোম্পানির পরিচালনাধীন কিছু গ্যাসক্ষেত্রে মজুত থাকলেও উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ প্রত্যাশিত মাত্রায় হয়নি।
এ অবস্থায় নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, নতুন কূপ খনন, পুরোনো কূপে উন্নয়নমূলক কাজ এবং গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করার বিকল্প নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, গ্যাসকূপের মজুত কমে আসা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও নিয়ম অনুযায়ী একই সঙ্গে নতুন গ্যাসকূপের অনুসন্ধান ও খনন চালিয়ে যেতে হয়। দীর্ঘদিন তা যথেষ্ট মাত্রায় করা হয়নি। ফলে সামনে গ্যাস সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তাঁর মতে, শুধু এলএনজি আমদানি করে দীর্ঘমেয়াদে দেশের গ্যাসের চাহিদা সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। তাই সরকারকে এখনই দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
সব মিলিয়ে গ্যাসের চাহিদা বৃদ্ধির বিপরীতে দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়া বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় সতর্কবার্তা। নতুন অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ এখনই নেওয়া না হলে আগামী দশকে শিল্প, বিদ্যুৎ ও পরিবহনসহ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে গ্যাস সংকটের প্রভাব আরও গভীর হতে পারে।






