দ্বিপক্ষীয় সফরে ভারত যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

দ্বিপক্ষীয় সফরে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের টানাপোড়েন কাটানোর উদ্যোগ; আলোচনায় গঙ্গা-তিস্তা, বাণিজ্য ও শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ

টুইট ডেস্ক: নানা জল্পনা-কল্পনার মধ্যেই চলতি মাসে ভারত সফরে যেতে পারেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ঢাকা ও নয়াদিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, দুই দেশের সম্পর্ককে ইতিবাচক, স্থিতিশীল ও জনকেন্দ্রিক ভিত্তির ওপর পুনর্গঠন করাই হবে সম্ভাব্য এই সফরের মূল লক্ষ্য।

আগামী সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগেই তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় সফর হতে পারে বলে কূটনৈতিক সূত্রের দাবি। এমনকি চলতি আগস্টেই তিনি দিল্লি যেতে পারেন। তবে ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নিজে অংশ নেবেন কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

ভারতের আমন্ত্রণ গ্রহণ করে নয়াদিল্লি সফরের সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, গত দুই বছরে দুই দেশের সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক পুনর্গঠনে এই সফর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

আলোচনায় যেসব বিষয়

সম্ভাব্য সফরে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে সরাসরি আলোচনায় গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন চুক্তির নবায়ন, তিস্তার পানি বণ্টন, বাণিজ্যিক বাধা দূর করা এবং দুই দেশের মানুষের যোগাযোগ সহজ করার মতো বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে।

এর পাশাপাশি শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুও আলোচনায় আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে।

শীতল সম্পর্ক স্বাভাবিকের চেষ্টা

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের দৃশ্যপটে বড় পরিবর্তন আসে। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকর্মী ভারতে অবস্থান নেওয়ার পর সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও বাড়ে।

এর মধ্যে ভিসা কার্যক্রমে সীমাবদ্ধতা, বাণিজ্যে পারস্পরিক বিধিনিষেধ, সীমান্ত ও নিরাপত্তা ইস্যু এবং শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়। বিভিন্ন সময়ে ভারতীয় কূটনৈতিক স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দেয়।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের নয়াদিল্লি সফরের পর দুই পক্ষই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে গুরুত্ব দেয়। এরপর ধাপে ধাপে ভিসা কার্যক্রম চালু, যাত্রীবাহী বাস চলাচল পুনরায় শুরু এবং জ্বালানি সংকটে ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে ডিজেল সরবরাহের মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়।

মোদির আমন্ত্রণ, এবার দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সম্ভাবনা

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে ফোন করেন এবং ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানান। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর শপথ অনুষ্ঠানেও ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা ও পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিসরি উপস্থিত ছিলেন।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘটনাকে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে ভারতের ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা যায়।

সম্প্রতি ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। পরে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গেও বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা হয়।

বৈঠকের পর ভারতের হাইকমিশনারও দুই দেশের সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেন। একই সময়ে দিল্লিতে ফিরে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেন।

কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, সম্ভাব্য তারেক রহমানের দিল্লি সফর হলে দুই দেশের সম্পর্কের জট খুলতে সরাসরি রাজনৈতিক আলোচনা বড় সুযোগ তৈরি করবে। বিশেষ করে পানি, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও প্রত্যর্পণের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে রাজনৈতিক পর্যায়ে সমঝোতার পথ তৈরি হতে পারে।

সব মিলিয়ে, দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন কাটিয়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে নতুন ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফরকে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।