দেশজুড়ে তীব্র লোডশেডিং, সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে গ্রামের মানুষ

গ্যাস ও কয়লার সংকটে কমেছে উৎপাদন, কোথাও কোথাও দিনে ১০ থেকে ১৫ ঘণ্টাও থাকছে না বিদ্যুৎ
টুইট ডেস্ক: দেশজুড়ে তীব্র লোডশেডিংয়ে জনজীবনে নেমে এসেছে দুর্ভোগ। গ্যাসের সংকট, কয়লা সরবরাহে ঘাটতি ও বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি সমস্যার কারণে উৎপাদন কমে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রামাঞ্চলের মানুষ। কোথাও কোথাও দিনে ১০ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না বলে অভিযোগ করেছেন গ্রাহকেরা।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক দিন ধরে দেশে প্রতিদিন সর্বোচ্চ লোডশেডিং তিন হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সোমবার রাত ৮টা পর্যন্ত সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল তিন হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট। এর আগের দিন ছিল তিন হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট।
বর্তমানে গ্যাসের ঘাটতির কারণে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন কমেছে। পাশাপাশি কয়লাচালিত কয়েকটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও উৎপাদন কমেছে। ব্যয়বহুল হওয়ায় তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও সার্বক্ষণিক পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো হচ্ছে না।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। সোমবার সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের সময় চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ২৬২ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ ছিল সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াটের মতো। অর্থাৎ ওই সময়ে উৎপাদন সক্ষমতার বড় একটি অংশ কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
গ্যাস ও কয়লার সংকট
বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানিস্বল্পতা বর্তমানে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্যাসের সরবরাহ এখনো স্বাভাবিক হয়নি। একই সঙ্গে কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন কমেছে।
পটুয়াখালীর পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিটে রক্ষণাবেক্ষণ শুরু হওয়ায় ২ আগস্ট থেকে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে যায়। গত রোববার রাত থেকে কেন্দ্রটি আবার চালু করে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। তবে কেন্দ্রটির বকেয়া পাওনা ৯ হাজার কোটি টাকার বেশি। বিল পরিশোধ না হলে আগামী মাস থেকে কয়লা সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পটুয়াখালীর আরেকটি কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রেও কয়লার সংকটে উৎপাদন কমেছে। অন্যদিকে ভারতের ঝাড়খন্ডে নির্মিত আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র ৭ আগস্ট থেকে উৎপাদন কমিয়েছে। ঝড়-বৃষ্টির কারণে কয়লা সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় কেন্দ্রটি স্বাভাবিক উৎপাদন ধরে রাখতে পারেনি।
আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের পক্ষ থেকে মঙ্গলবার রাতে জানানো হয়েছে, ১২ আগস্টের মধ্যে কয়লা সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার কথা রয়েছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, গ্যাস ও কয়লা—দুই জ্বালানিরই স্বল্পতা রয়েছে। তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র সার্বক্ষণিক চালানো ব্যয়বহুল হওয়ায় সন্ধ্যার পর লোডশেডিং কমাতে উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে। মধ্যরাতের পর উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া হলে লোডশেডিং বেড়ে যাচ্ছে।
ঢাকার বাইরে সংকট তীব্র
ঢাকার দুই বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ডেসকো ও ডিপিডিসির এলাকায় চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা গেলেও ঢাকার বাইরের পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে খারাপ। পল্লি বিদ্যুৎ বোর্ডের মাধ্যমে দেশের গ্রামাঞ্চলে সরবরাহ করা বিদ্যুতের ঘাটতি বেশি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ফেনীতে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৪০ মেগাওয়াট হলেও গড়ে প্রতিদিন ঘাটতি থাকছে ৩০ মেগাওয়াট। ফেনী পল্লি বিদ্যুৎ বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সেখানে প্রায় ১৫ শতাংশ বিদ্যুৎ ঘাটতি রয়েছে। একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পরিচালক জানিয়েছেন, প্রতিদিন গড়ে ৩৫ শতাংশ সময় লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
নেত্রকোনায় পরিস্থিতি আরও খারাপ। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ২৪ ঘণ্টায় গড়ে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। জেলা পল্লি বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক আকরাম হোসেন জানান, সেখানে ১৫৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ৫৯ মেগাওয়াট।
হবিগঞ্জের বিভিন্ন এলাকাতেও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। বিশেষ করে চা-বাগানগুলোতে এর প্রভাব পড়েছে। চুনারুঘাটের দেউন্দি চা-বাগানের সহকারী ব্যবস্থাপক দেবাশীষ রায় জানান, চা-পাতা প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে পাতা নষ্ট হয়ে যায়। এতে বাগানগুলোকে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।
কেরানীগঞ্জেও ধারাবাহিক লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দিনের পাশাপাশি রাতেও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। প্রচণ্ড গরমে শিশু ও বয়স্কদের সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। ঢাকা পল্লি বিদ্যুৎ সমিতি-৪-এর মহাব্যবস্থাপক গোলাম কাউসার তালুকদার জানান, কেরানীগঞ্জে বিদ্যুতের চাহিদা ২৪০ মেগাওয়াট হলেও প্রতিদিন প্রায় ৮০ মেগাওয়াট ঘাটতি থাকছে।
ক্ষোভ বাড়ছে, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় নীলফামারীর ডোমারেও গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিদ্যুৎ স্থাপনা ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে নীলফামারী পল্লি বিদ্যুৎ সমিতি।
ডোমার থানায় দেওয়া এক আবেদনে গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ স্থাপনাগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার ও নিয়মিত পুলিশি টহলের ব্যবস্থা করার অনুরোধ করা হয়েছে। আবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয় গ্রিডে উৎপাদন ও সরবরাহ ঘাটতির কারণে নির্ধারিত বরাদ্দ অনুযায়ী বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। এতে গরমের মধ্যে গ্রাহকদের দুর্ভোগ বাড়ার পাশাপাশি জনমনে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
নীলফামারী সদরের এক বাসিন্দা বলেন, কয়েক দিন ধরে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে।
ডোমার উপজেলা নেসকোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নওশাদ আলী বলেন, প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেক বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রাহকেরা ১০ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না।
বাড়তি দামে বিদ্যুৎ, তবু স্বস্তি নেই
এরই মধ্যে গত জুনে পাইকারি পর্যায়ে গড়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। তারপরও বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপুল বকেয়া পরিশোধ করতে পারছে না বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ফলে বাড়তি আয় পেতে কিছুটা সময় লাগবে। পুরোনো বকেয়া ধাপে ধাপে পরিশোধের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের বর্তমান সংকট কাটাতে সবচেয়ে জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে পর্যাপ্ত জ্বালানি নিশ্চিত করা।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়বে। তবে গ্যাস ও কয়লা সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত লোডশেডিং থেকে দ্রুত মুক্তি মিলবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।






