এক দফার দাবিতে উত্তাল রাজশাহী, শিক্ষকদের একাত্মতায় চূড়ান্ত রূপ নেয় আন্দোলন

অসহযোগ আন্দোলনের ডাকে রাজপথে ছাত্র-জনতা, শিক্ষক-অভিভাবক ও পেশাজীবীদের নজিরবিহীন অংশগ্রহণ
নিজস্ব প্রতিবেদক: চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে ৪ আগস্ট ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ধারণী দিনগুলোর একটি। এদিনই স্পষ্ট হয়ে যায়, সরকার পতনের আন্দোলন আর পিছু হটার নয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে দেশজুড়ে শুরু হয় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন। রাজধানীর পাশাপাশি রাজশাহীও পরিণত হয় আন্দোলনের অন্যতম শক্তিশালী কেন্দ্রবিন্দুতে।
সকাল থেকেই রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) প্রধান ফটকের সামনে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরু হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই সেখানে যোগ দেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী কলেজ, নিউ গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক, পেশাজীবী এবং সর্বস্তরের মানুষ। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলন বিশাল গণসমাবেশে রূপ নেয়।
আন্দোলনকারীদের হাতে ছিল জাতীয় পতাকা, প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে কাফনের কাপড় এবং নানা ধরনের ব্যানার। স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে রাজপথ। আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সহ-সমন্বয়ক সালাউদ্দিন আম্মার কাফনের কাপড় পরে মিছিলে অংশ নেন।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সালেহ্ হাসান নকীব বলেন, শিক্ষার্থীদের ন্যায়সংগত দাবি ও সাহসিকতা দেশের ভবিষ্যতের জন্য আশার প্রতীক। তিনি আন্দোলনকারীদের সংযম বজায় রেখে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ও বর্তমান উপাচার্য ড. মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, দেশের মানুষ সরকারের প্রতি আস্থা হারিয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের ন্যায়সঙ্গত দাবির পাশে শিক্ষক সমাজ রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি আন্দোলনের সময় রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন।
রুয়েট থেকে বের হওয়া বিক্ষোভ মিছিল ভদ্রা হয়ে তালাইমারী এলাকায় পৌঁছালে মতিহার থানা পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ বাধে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। জবাবে আন্দোলনকারীরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং সড়কে ব্যারিকেড দেন। সংঘর্ষে কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন এবং তাদের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তবে ওই দিনের ঘটনায় রাজশাহীতে কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।
৪ আগস্টের স্মৃতিচারণ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক মেহেদী সজিব বলেন, ওই দিনটি আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। ইন্টারনেট বন্ধ থাকলেও বিকল্প উপায়ে সমন্বয় করে কেন্দ্রীয় কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা হয়। শিক্ষক, অভিভাবক, আইনজীবী, চিকিৎসক ও ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণে আন্দোলন ছাত্রদের গণ্ডি পেরিয়ে গণআন্দোলনে পরিণত হয়েছিল।
সাবেক সমন্বয়ক ও রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মার বলেন, ৪ আগস্ট ছিল চূড়ান্ত প্রস্তুতির দিন। আন্দোলনের নৈতিক শক্তি অক্ষুণ্ন রাখতে সবাইকে শান্তিপূর্ণ থাকার আহ্বান জানানো হয়েছিল। রাজশাহীর মানুষের ঐক্যবদ্ধ উপস্থিতি আন্দোলনকে নতুন শক্তি জুগিয়েছিল।
সেদিন রাজধানীতে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি একদিন এগিয়ে আনার সিদ্ধান্তের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাজশাহীতেও চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেওয়া হয়। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষের ঐক্যবদ্ধ অংশগ্রহণে রাজশাহীর আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়।
পরদিন ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সরকারের পতন ঘটে। সেই বিজয়ের ভিত্তি রচিত হয়েছিল ৪ আগস্টের অসহযোগ আন্দোলন, সাহস, ঐক্য এবং গণজোয়ারের মধ্য দিয়ে। রাজশাহী সেই ইতিহাসে ছিল অন্যতম সক্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।






