এক টুকরো মানবতা: বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর পাকিস্তান হয়ে ইরান যাত্রার গল্প

ইতিহাসের কাঁটাতার ও বর্তমানের বাস্তবতা: কেমন ছিল সাধারণ পাকিস্তানিদের ব্যবহার? একটি নিরাপদ যাত্রা ও এক বাবার কৃতজ্ঞতা
বিশেষ প্রতিবেদক: রাজনীতি আর ইতিহাসের কাঁটাতার যেখানে দুই দেশের সম্পর্কে অদৃশ্য এক দেয়াল তুলে রাখে, সাধারণ মানুষের হৃদয় সেখানে সেই দেয়াল ভেঙে দেয় অবলীলায়। ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ইতিহাস আর দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক শীতলতার পথ মাড়িয়ে এক বাংলাদেশি তরুণ শিক্ষার্থীর পাকিস্তান হয়ে ইরান যাত্রার অভিজ্ঞতা ঠিক এই সত্যটিই আবার সামনে নিয়ে এলো। প্রতিটি পদক্ষেপে রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সাধারণ পাকিস্তানি নাগরিকদের মোলায়েম আচরণ, আতিথেয়তা এবং নিঃস্বার্থ সহযোগিতা মুগ্ধ করেছে এক বাংলাদেশি পরিবারকে।
বন্ধ দরজায় আন্তরিকতার কড়া নাড়া
ঘটনার সূত্রপাত গত জুনের শেষভাগে। ঢাকার এক শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার গন্তব্য ইরানের তেহরান মেডিকেল ইউনিভার্সিটি। কিন্তু ট্রানজিট নিতে হবে পাকিস্তান হয়ে। স্বভাবতই প্রয়োজন পাকিস্তানি এন্ট্রি ভিসার। ঢাকায় পাকিস্তান হাইকমিশনে কোনো পূর্ব পরিচিতি না থাকায় কিছুটা দ্বিধা নিয়েই গুলশানের এজেন্সিতে যান শিক্ষার্থীর অভিভাবক। এক প্রবীণ সাংবাদিক বন্ধুর মাধ্যমে হাইকমিশনের এক কর্মকর্তার যোগাযোগ নম্বর মেলে।
দিনটি ছিল পবিত্র আশুরা উপলক্ষে সরকারি ছুটির দিন, ভিসা কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই বন্ধ। তবুও এজেন্সির পরামর্শে বেলা দেড়টার দিকে সন্তানকে নিয়ে হাইকমিশনে হাজির হন সেই অভিভাবক। কিন্তু সেখানে গিয়ে যা দেখলেন, তা ছিল তাদের ধারণার অতীত।
ভিসা সেকশনের কর্মকর্তারা ছুটির দিনেও তাদের শুধু ভেতরেই ডেকে নিলেন না, বরং চা-বিস্কুট খাইয়ে পরম আত্মীয়ের মতো আপ্যায়ন করলেন। ফোনে কথা হওয়া ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও দ্রুত সেখানে এসে উপস্থিত হন। তাঁদের কথাবার্তা এবং আচরণে ছিল দীর্ঘদিনের চেনা মানুষের মতো আন্তরিকতা। অভিভাবকের কষ্ট কমাতে তাঁরা সাফ জানিয়ে দিলেন, রোববারে সন্তান একাই এসে যেন পাসপোর্ট জমা দেয়, ওই দিনই ভিসা হয়ে যাবে। কথামতো রোববার সকাল সকাল ভিসা কর্মকর্তা নিজেই ফোন করে খোঁজ নেন এবং পরদিনই ভিসা বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
করাচি ও ইসলামাবাদের পথে পথে আতিথেয়তা
গত ৪ জুলাই রাতে তরুণ শিক্ষার্থী পৌঁছান করাচি বিমানবন্দরে। পাকিস্তান থেকে ইরানের টিকিট কাটার ক্ষেত্রে বড় ভাইয়ের মতো এগিয়ে আসেন তেহরান মেডিকেলে তাঁর সাবেক পাকিস্তানি রুমমেট। শুধু টিকিট কেটেই ক্ষান্ত হননি তিনি, করাচি ও ইসলামাবাদে হোটেলের অগ্রিম বুকিংও করে দেন সেই পাকিস্তানি তরুণ।
করাচি পৌঁছানোর পর বিমানবন্দর সংলগ্ন একটি ফ্ল্যাটে রাত দেড়টায় যখন বাংলাদেশি এই তরুণ ওঠেন, তখন পাশের ফ্ল্যাটের পাকিস্তানি বাড়ির মালিক পরিবারটি গভীর রাতেও তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায় এবং আম কেটে খাওয়ায়।
পকেটের টাকা দিয়ে টিকিট, অচেনা যুবকদের ‘জবরদস্ত’ নাস্তা
সবচেয়ে চমকপ্রদ ঘটনাটি ঘটে করাচি বিমানবন্দর এলাকার একটি মানি এক্সচেঞ্জে। ইউরো ভাঙিয়ে পাকিস্তানি রুপি করার সময় ওই তরুণের সাথে আচমকা আলাপ হয় ইসলামাবাদ থেকে আসা কয়েকজন তরুণ পাকিস্তানি ইঞ্জিনিয়ারের সাথে। বাংলাদেশি পরিচয় পাওয়ার পর মুহূর্তের মধ্যেই তাঁরা যেন আপনজন হয়ে ওঠেন।
জানতে পারেন, ওই তরুণ বাসে করে ২০ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে ইসলামাবাদ যাবেন। কথাপ্রসঙ্গে কোনো অজুহাত না শুনেই নিজেদের পকেট থেকে টাকা দিয়ে ইসলামাবাদের সবচেয়ে ভালো বাসের টিকিট কেটে দেন সেই পাকিস্তানি যুবকেরা। বাংলাদেশি তরুণের কাছ থেকে টিকিটের মূল্য বাবদ কোনো রুপি নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে রসিকতা করে বলেন, “আমরা কখনো তেহরান গেলে খাইয়ে দিও, আর বাংলাদেশে গেলে আমাদের জন্য খরচ কোরো।” এখানেই শেষ নয়, বিমানবন্দর এলাকার এক রেস্তোরাঁয় নিয়ে গিয়ে ওই তরুণকে রাজকীয় নাস্তা করান এবং বিলও তারাই পরিশোধ করেন।
সীমান্তের ওপারেও ছড়ানো আলো
৯ জুলাই ইসলামাবাদ থেকে ইরানের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে ওই দিনই তেহরানে নিজের ইউনিভার্সিটির ডরমেটরিতে পৌঁছান বাংলাদেশি শিক্ষার্থী। পুরো যাত্রাপথে বাংলাদেশ থেকে বিদায় নেওয়ার সময়ও ঢাকার পাকিস্তানি কূটনীতিকরা প্রতিনিয়ত খোঁজ নিয়েছেন এবং যেকোনো সমস্যায় পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন।
সাক্ষাৎকার নেওয়ার সূত্রে পরিচয় হওয়া এক পাকিস্তানি টেলিভিশন সাংবাদিকও করাচিতে রিসিভ করার জন্য উন্মুখ হয়ে ছিলেন। অতীতে রেডিও তেহরানের উর্দু প্রোগ্রামে কাজ করার সুবাদে পাকিস্তানিদের যে আন্তরিক রূপ এই অভিভাবক দেখেছিলেন, এবার ছেলের বাস্তব অভিজ্ঞতায় তা যেন আরও দৃঢ় হলো।
ইতিহাসের ঊর্ধ্বে মানুষের গল্প
পেশাদারিত্ব বা দায়িত্বের খাতিরে নয়, বরং সহজাত মানবিকতাবোধ থেকেই পাকিস্তানি নাগরিকরা এই আতিথেয়তা দেখিয়েছেন। যে দেশের সাথে একাত্তরের যুদ্ধের ঐতিহাসিক ক্ষত রয়েছে, সেই দেশের সাধারণ মানুষের এই মোলায়েম আচরণ ও পরম মমত্ববোধ আজ নতুন করে ভাবাচ্ছে।
সবশেষে, ঢাকা থেকে করাচি, করাচি থেকে ইসলামাবাদ হয়ে তেহরান—এই দীর্ঘ পথজুড়ে যে পাকিস্তানি নাগরিকরা একজন বাংলাদেশি তরুণকে পরম যত্নে আগলে রেখে গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও শুভকামনা জানিয়েছেন তাঁর পরিবার। এই গল্প মনে করিয়ে দেয়—মানচিত্রের সীমানা যতই কঠোর হোক, মানুষের হৃদয়ের সীমানা আসলে অসীম।
সূত্র: সংগৃহীত






