মানসিক স্বাস্থ্যকে জাতীয় অগ্রাধিকার করার এখনই সময়

বাংলাদেশে প্রতি পাঁচজন প্রাপ্তবয়স্কের একজন মানসিক সমস্যায় ভুগলেও চিকিৎসা পাচ্ছেন মাত্র ৯ শতাংশ; বিশেষজ্ঞ সংকট, সামাজিক কুসংস্কার ও সেবার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ।

টুইট প্রতিবেদক:বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে আলোচনা হলে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যানসার কিংবা সংক্রামক রোগই সাধারণত বেশি গুরুত্ব পায়। অথচ সুস্থ ও উৎপাদনশীল সমাজ গঠনে মানসিক স্বাস্থ্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নীতি, আইন ও কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হলেও বাস্তবায়নের ঘাটতি এবং সামাজিক সংকোচের কারণে বিষয়টি এখনো জাতীয় অগ্রাধিকারের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৯-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ৭ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের ১২ দশমিক ৬ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছে। অর্থাৎ প্রতি পাঁচজন প্রাপ্তবয়স্কের একজন এবং প্রতি আটজন শিশুর একজনের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো চিকিৎসাসেবার বিশাল ঘাটতি। জরিপ বলছে, আগে থেকে মানসিক রোগ শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে মাত্র ৯ শতাংশ চিকিৎসা নিয়েছেন।

৯১ শতাংশ মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। এই বাস্তবতা দেশের মানসিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক রোগ নিয়ে সামাজিক কুসংস্কার, অপচিকিৎসা, ওষুধ সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা, সহজলভ্য চিকিৎসাসেবার অভাব এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীর স্বল্পতা,সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

জরিপে দেখা যায়, বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে মানসিক সমস্যার হারও বাড়ছে। ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে এ হার প্রায় ২০ শতাংশ। একই সঙ্গে নারীদের মধ্যে মানসিক সমস্যার হার পুরুষদের তুলনায় বেশি। পারিবারিক দায়িত্ব, সামাজিক বৈষম্য, সহিংসতা, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

শহর ও গ্রামের মধ্যে কিংবা ধনী ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে মানসিক সমস্যার প্রকোপে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য নেই। অর্থাৎ এটি কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি বা অঞ্চলের সমস্যা নয়; বরং সমগ্র সমাজের একটি বাস্তব সংকট।

বর্তমানে প্রায় ১৮ কোটি মানুষের জন্য দেশে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন মাত্র সাড়ে চারশোর মতো এবং মনোবিজ্ঞানী প্রায় এক হাজার। প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা মাত্র শূন্য দশমিক দুই এবং মনোবিজ্ঞানী শূন্য দশমিক তিন। পাশাপাশি প্রশিক্ষিত মানসিক স্বাস্থ্য নার্স, সমাজকর্মী, কর্মচিকিৎসক ও অন্যান্য সহায়ক পেশাজীবীরও বড় ঘাটতি রয়েছে।

দেশে বিশেষায়িত মানসিক হাসপাতাল মাত্র দুটি,পাবনা মানসিক হাসপাতাল ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট। এছাড়া কয়েকটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মনোরোগ বিভাগ থাকলেও সেগুলোর সক্ষমতা সীমিত। ফলে রাজধানীর বাইরে অধিকাংশ মানুষ প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হন।

সরকার ইতোমধ্যে ২০১৮ সালে মানসিক স্বাস্থ্য আইন প্রণয়ন, ২০২২ সালে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য নীতি অনুমোদন এবং ২০২০-২০৩০ মেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সংযুক্ত করার উদ্যোগও চলছে। তবে এসব উদ্যোগের সুফল এখনো সাধারণ মানুষের কাছে প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক কুসংস্কার এখনো সবচেয়ে বড় বাধা। অনেকেই মানসিক রোগকে ‘পাগলামি’ হিসেবে দেখেন কিংবা বিষণ্নতাকে গুরুত্ব দেন না। এ কারণে অনেক পরিবার রোগ গোপন রাখে এবং চিকিৎসা নিতে দেরি করে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

আত্মহত্যার ঝুঁকিও উদ্বেগজনক। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৪ দশমিক ৮ শতাংশ কিশোর ও তরুণ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে আত্মহত্যার চিন্তা করেছে এবং প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ পরিকল্পনা করেছে বা চেষ্টা করেছে। এ কারণে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা এবং সহায়তামূলক পরিবেশ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।

অর্থনৈতিক চাপ, বেকারত্ব, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, দ্রুত নগরায়ণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার ও একাকীত্ব তরুণদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, আসক্তি এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট বাড়িয়ে দিচ্ছে।

অন্যদিকে প্রবীণদের মধ্যে একাকীত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা মানসিক সমস্যার ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি করছে।

বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ অনুযায়ী, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, আরও বেশি মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানী তৈরি, টেলি-মানসিক স্বাস্থ্যসেবা চালু, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিং ব্যবস্থা জোরদার এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি।

তাদের মতে, মানসিক স্বাস্থ্যকে বিলাসিতা নয়, মৌলিক স্বাস্থ্য অধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। সময়মতো বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা পেলে অধিকাংশ মানসিক রোগীই স্বাভাবিক ও কর্মক্ষম জীবনযাপন করতে পারেন।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, একটি দেশের উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে নয়; মানুষের মানসিক সুস্থতা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করার মাধ্যমেও পরিমাপ করা উচিত। কারণ সুস্থ মনই একটি সুস্থ ও টেকসই সমাজের ভিত্তি।