আর্জেন্টিনার সামনে বিশ্বকাপের বিস্ময় কেপ ভার্দে

অভিষেক বিশ্বকাপেই নকআউটে উঠে ইতিহাস গড়া ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র এবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিপক্ষে নতুন রূপকথা লেখার স্বপ্নে।

টুইট প্রতিবেদক: বিশ্বকাপে প্রথম অংশগ্রহণেই ফুটবল বিশ্বকে বিস্মিত করেছে কেপ ভার্দে। মাত্র প্রায় পাঁচ লাখ জনসংখ্যার আটলান্টিক মহাসাগরের এই দ্বীপরাষ্ট্র বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে ছোট দেশ হিসেবে নকআউট পর্বে উঠে নতুন নজির গড়েছে। এবার রাউন্ড অব ৩২-এ তাদের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা,বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।

গ্রুপ পর্বেই নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে কেপ ভার্দে। স্পেন, উরুগুয়ে ও সৌদি আরবকে নিয়ে গঠিত কঠিন গ্রুপে অপরাজিত থেকে দ্বিতীয় হয়ে শেষ করেছে তারা। ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে দেওয়া এবং উরুগুয়ের মতো শক্তিশালী দলকে রুখে দেওয়া দলটির আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে।

প্রবাসী প্রতিভার ওপর দাঁড়িয়ে সাফল্যের ভিত

কেপ ভার্দের এই উত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা কেপ ভার্দীয় বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের জাতীয় দলে যুক্ত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে দেশটির ফুটবল ফেডারেশন।

বিশ্বকাপ স্কোয়াডের ২৬ সদস্যের মধ্যে ১৪ জনই বিদেশে জন্মগ্রহণ করেছেন। তাঁদের অনেকেই নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল ও আয়ারল্যান্ডে বেড়ে উঠেছেন। এমনকি পেশাজীবীদের যোগাযোগমাধ্যম ‘লিংকডইন’-এর মাধ্যমে যোগাযোগ করে সেন্টার-ব্যাক রবার্তো লোপেসকে জাতীয় দলে অন্তর্ভুক্ত করার ঘটনাও আন্তর্জাতিক ফুটবলে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।

দলের বিশ্বাস, ধারাবাহিক পরিকল্পনা, সঠিক প্রতিভা অনুসন্ধান এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ফলেই আজ তারা বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে।

ভোজিনহা এখন কেপ ভার্দের সবচেয়ে বড় ভরসা

কেপ ভার্দের সাফল্যের অন্যতম নায়ক ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহা। গ্রুপ পর্বে তিন ম্যাচের মধ্যে দুটি ক্লিন শিট রেখে তিনি আলোচনায় উঠে এসেছেন। বিশেষ করে স্পেনের বিপক্ষে একের পর এক দুর্দান্ত সেভ করে দলের নায়ক বনে যান তিনি।

বর্তমানে পর্তুগালের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব শ্যাভেসের হয়ে খেললেও দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অ্যাঙ্গোলা, মলদোভা, সাইপ্রাস, স্লোভাকিয়া ও পর্তুগালের বিভিন্ন ক্লাবে খেলেছেন এই অভিজ্ঞ গোলরক্ষক।

এ ছাড়া রক্ষণভাগে ডিনি বোর্জেস এবং মাঝমাঠে কেভিন পিনা দলের অন্যতম ভরসার নাম। কেভিন পিনা ও হেলিও ভ্যারেলা গ্রুপ পর্বে গোল করে আক্রমণভাগেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

বুবিস্তার হাতেই বদলে গেছে দলের পরিচয়

জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক পেদ্রো লেইতাও ব্রিটো, যিনি ‘বুবিস্তা’ নামে পরিচিত, ২০২০ সালে প্রধান কোচের দায়িত্ব নেওয়ার পর কেপ ভার্দের ফুটবলে নতুন যুগের সূচনা হয়।

তার অধীনে দলটি গড়ে তুলেছে সুশৃঙ্খল রক্ষণ, কৌশলগত বহুমুখিতা এবং দ্রুত পাল্টা আক্রমণনির্ভর কার্যকর ফুটবল। বিশ্বকাপে বড় বড় দলকে চাপে ফেলার পেছনে এই কৌশলই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।

বাছাইপর্বেও ছিল দুর্দান্ত আধিপত্য

বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে পাঁচ ম্যাচের সবকটিতেই জয় পেয়েছে কেপ ভার্দে। পুরো অভিযানে একটি গোলও হজম করেনি তারা। নিজেদের মাঠে এসওয়াতিনিকে ৩-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপ নিশ্চিত করার পাশাপাশি ক্যামেরুন ও অ্যাঙ্গোলার মতো শক্তিশালী দলকে পেছনে ফেলে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েই মূল পর্বে জায়গা করে নেয়।

ইতিহাসের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ

১৯৭৫ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর ১৯৭৮ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবলে যাত্রা শুরু করে কেপ ভার্দে। আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে একাধিকবার অংশ নিলেও ২০২৬ বিশ্বকাপই তাদের প্রথম বিশ্বমঞ্চ।

অভিষেক আসরেই নকআউট নিশ্চিত করে ইতিহাস গড়া দলটি এবার আর্জেন্টিনার বিপক্ষে আরও একটি চমক দেখানোর অপেক্ষায়।

শক্তির বিচারে আর্জেন্টিনা স্পষ্ট ফেবারিট হলেও এবারের বিশ্বকাপে কেপ ভার্দে প্রমাণ করেছে, পরিকল্পিত ফুটবল, শৃঙ্খলা ও আত্মবিশ্বাস থাকলে যে কোনো প্রতিপক্ষকেই কঠিন পরীক্ষায় ফেলা সম্ভব। তাই এই লড়াইকে কেবল দুই দলের ম্যাচ নয়, বরং বিশ্বকাপের আরেকটি সম্ভাব্য রূপকথার অধ্যায় হিসেবেই দেখছে ফুটবলবিশ্ব।