সমাজতন্ত্র থেকে কেন সরে যায় মানুষ

ইতিহাসের অভিজ্ঞতা, অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্নে নতুন বিতর্ক।
টুইট প্রতিবেদক: বিশ্বজুড়ে সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদ নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমা দেশগুলোতে অর্থনৈতিক বৈষম্য, আবাসন সংকট এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সমাজতান্ত্রিক নীতির প্রতি নতুন করে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। এরই মধ্যে প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে প্রশ্ন তোলা হয়েছে,ইতিহাসে কেন বহু মানুষ শেষ পর্যন্ত সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা থেকে দূরে সরে গেছে বা সেসব দেশ ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সমাজতন্ত্র সাধারণত সমতা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মানুষের সমর্থন অর্জন করে। বিংশ শতাব্দীতে পূর্ব ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে সমাজতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসে। তাদের লক্ষ্য ছিল দারিদ্র্য কমানো, বৈষম্য দূর করা এবং রাষ্ট্রের মাধ্যমে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা।
তবে বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে অনেক দেশেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি বলে দাবি করা হয়েছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও উৎপাদনের ওপর সরকারের প্রভাব ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। সমালোচকদের মতে, এর ফলে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি রাজনৈতিক স্বাধীনতাও সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
ইতিহাসের বিভিন্ন উদাহরণে দেখা গেছে, অতিরিক্ত কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা ও মূল্যনিয়ন্ত্রণ অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে এবং বাজারে পণ্যের সংকট সৃষ্টি করেছে।
রোমান সাম্রাজ্যের সম্রাট ডায়োক্লেশিয়ানের মূল্যনিয়ন্ত্রণ নীতি থেকে শুরু করে ব্রাজিল ও ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন অর্থনৈতিক পরীক্ষার ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যার কথা অর্থনীতিবিদরা তুলে ধরেছেন।
প্রবন্ধটিতে আরও উল্লেখ করা হয়, পূর্ব জার্মানি থেকে পশ্চিম জার্মানি, কিউবা থেকে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ভেনেজুয়েলা থেকে প্রতিবেশী দেশগুলোতে মানুষের ব্যাপক অভিবাসন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক বাস্তবতা।
বিশ্লেষকদের মতে, মানুষ সাধারণত নিজের ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিবার ছেড়ে অন্য দেশে পাড়ি জমায় তখনই, যখন তারা উন্নত জীবনযাত্রা, অধিক অর্থনৈতিক সুযোগ বা বৃহত্তর স্বাধীনতার প্রত্যাশা করে।
তবে বিষয়টি একমুখী নয়। অর্থনীতি ও রাজনীতি নিয়ে চলমান আন্তর্জাতিক আলোচনায় অনেক গবেষক ও পর্যবেক্ষক মনে করেন, আধুনিক ইউরোপের কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা কিংবা স্ক্যান্ডিনেভিয়ার সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোকে সরাসরি সমাজতন্ত্র বলা যায় না। এসব দেশে বাজারভিত্তিক অর্থনীতির পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সমন্বয় রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইতিহাসের প্রধান শিক্ষা হলো,কোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কেবল তার আদর্শগত প্রতিশ্রুতি দিয়ে নয়, বরং বাস্তব ফলাফল দিয়ে মূল্যায়িত হয়। একদিকে অতিরিক্ত রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ যেমন সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে, অন্যদিকে নিয়ন্ত্রণহীন বাজারব্যবস্থাও বৈষম্য ও সামাজিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে। ফলে সফল রাষ্ট্রগুলো সাধারণত বাজারের উদ্ভাবনী শক্তি ও রাষ্ট্রের সামাজিক দায়িত্বের মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে।
অর্থনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে বিশ্বব্যাপী নতুন করে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছে এই প্রশ্ন?সমতা, স্বাধীনতা এবং সমৃদ্ধির মধ্যে কোন ভারসাম্য একটি সমাজের জন্য সবচেয়ে কার্যকর। ইতিহাসের অভিজ্ঞতা সেই বিতর্কে এখনো গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।






